আইন পড়ার সূচনাটা শখের বশেই হয়েছিল অনেকটা। থ্রিলার, ক্রাইম—এ জাতীয় বিষয় মুভি কিংবা ওয়েব সিরিজে দেখতে দেখতেই অপরাধবিজ্ঞান ও আইন—এই দুটো বিষয়ের প্রতি তীব্র মানসিক তৃষ্ণা জন্মে। সে তৃষ্ণার নিবারণ ঘটল কিছুদিন আগে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাঙ্গন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে। সময়ের বিবেচনায় স্বল্প, তবে জ্ঞানের বিবেচনায় দীর্ঘ এ যাত্রার পুরোটা সময়েই উত্থান-পতন সঙ্গী ছিল। অবশেষে, ক্ষুদ্র জ্ঞানের একটা অংশ শেষ করে অর্জন করেছি কালো অক্ষরের সনদ।
১৭ জুন, ২০২৫— শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগদান করে আইন অঙ্গনে আমার যাত্রা শুরুর প্রথম দিন এটি। দিনটি বৃষ্টিভেজা শীতল যেমন ছিল, তেমনই হৃদয়ের মাঝেও অনুভব করেছিলাম শীতলতার পরশ। এলএলএম-এর পরিবেশ আইন ক্লাস করেই ছুটে চলেছি বিজ্ঞ আইনজীবী, বাংলাদেশের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস স্যারের দপ্তরে। পুরান ঢাকার ঘনবসতি আর দালানকোঠার ঠাসাঠাসি পরিবেশ আদালতের আঙিনায় আমার প্রথম যাত্রাকে নিরর্থক করে তুললেও, সেদিন হালকা ঝাপটা বৃষ্টি পরিবেশটাকে সহনীয় করেই রেখেছিল।
প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস, যাঁকে সবাই প্রকাশ স্যার বলেই সম্বোধন করেন, তাঁর দপ্তরে পৌঁছলে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পালা। এরপর স্যার শুরু করলেন জীবনের গল্প, শোনালেন আইন যাত্রায় তাঁর দীর্ঘ পথচলার কাহিনি। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলাম আদালতপাড়ায় তাঁর জীবনসংগ্রাম, শ্রম এবং আদালত প্রাঙ্গণের প্রতিটি ইট-বালু-সিমেন্টের সাথে তাঁর সখ্যতার গল্প। পরিশ্রমের বাস্তবিক গল্প। তাঁর গল্প যেমন শুনেছি, তেমনি উপলব্ধিও করেছি।
ক্ষুদ্রতম আইন ছাত্রজীবনে যতদূর উপলব্ধি ছিল, সেটা হলো—আইনের বেড়াজালে থাকলে মানুষ একসময় ধারা, উপধারায় হারিয়ে যায়। কিন্তু স্যারের সঙ্গে গল্পে মশগুল হয়ে জানলাম এক নতুন চমকপ্রদ বিষয়। আমি মুগ্ধ এবং আনন্দিত হলাম এটা উপলব্ধি করে যে, আইনের বেড়াজালে বন্দী হলেই মানুষের জীবন যান্ত্রিক হয়ে যায় না। আইনজীবী হিসেবে জীবন পার করে দিলেও যে সাহিত্যরসে নিজেকে বিলীন করা যায়, সেটা প্রকাশ স্যারের সাহিত্যরস আর শুদ্ধতায় ঘেরা কথাগুলো না শুনলে হয়তো জানাই হতো না।
আমি জানতাম ধারা-উপধারার বেড়াজালে একজন আইনজীবী নিজের অজান্তেই শিরা-উপশিরায় খেলে যান আইনের খেলা। এক্ষেত্রে প্রকাশ স্যারের ভিন্নধর্মী বহিঃপ্রকাশ যে কাউকে তৃপ্ত করে তুলবে নিশ্চয়ই।
গল্পের ফাঁকে ফাঁকেই প্রথম সাক্ষাৎ বা করণীয় কর্মকাণ্ডগুলো সমাপ্ত করতে সার্বিক সহযোগিতায় নিজেকে উজাড় করেছিলেন বিজ্ঞ আইনজীবী মিফতাহুর রহমান স্যার। স্বল্প ভাষায় অনেকটা ঠান্ডা মাথায় তিনিও অনেক বিষয় জানাবার চেষ্টা করেছেন নিরলসভাবে।
আর হ্যাঁ, প্রথম দিনের স্বপ্নযাত্রার আড্ডায় সার্বক্ষণিক বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে ছিল বন্ধুবর পিপলু মজুমদার। অন্যদিকে সমস্ত অনুপ্রেরণায়, কর্মসম্পাদনে তথা দিকনির্দেশনায় পুরোটা সময় নিজেকে উজাড় করেছিলেন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক, শরীয়তপুরের প্রখ্যাত সিরাজ সিকদার ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পলাশ রাউত। তিনি আর কেউ নন, তিনি আমার জন্মদাতা।
ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ছুঁই ছুঁই হলে আমাদের প্রস্থানের সময় হয়। প্রকাশ স্যার সোজাসাপটা জানিয়ে দিলেন, প্রতিদিন আদালতে আসতে হবে। আর যদি এলএলএম-এর ক্লাস করে না কুলায়, তাহলে অন্ততপক্ষে সপ্তাহে ৩/৪ দিন আদালতের বারান্দায় ঢুঁ দিতেই হবে।
তিনি বললেন, আদালতপাড়ায় ঘোরাফেরা, কোথায় কোন আদালত বসে তা জানা, এজলাস কক্ষে বসে বা দাঁড়িয়ে অন্য আইনজীবীদের শুনানি শোনা এবং তা অনুসরণ করা আইন শিক্ষার বড় অংশ।
তাঁর মতে, আইন পড়ার চাইতেও এখানকার হাওয়া-বাতাসে অনেক কিছু জানতে হয়। এখানে অনেক কিছুই হয়, অনেক কাজ নিজেকে অনুপ্রাণিত করবে, আবার এমন অনেক কিছুই চোখে পড়বে যেটা দেখলে মনে হবে, এঁরা কি আইনজীবী? এটা কি আইন পেশা?
আমি বুঝলাম স্যারের এ নির্দেশনাগুলো জীবনবোধ গঠনে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবে। তাই স্যারের কাছে তাঁর নির্দেশনা মেনে নিয়মিত দীক্ষা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলাম। সবশেষে বেরিয়ে পড়লাম স্বপ্নমাখা মুখ নিয়ে, খোলা আকাশের মতো মুক্ত এক জীবনের লক্ষ্য নিয়ে—অবশ্যই সে জীবন হবে মুক্ত, স্বাধীন কিংবা পোক্তমতো নিজের আদর্শ, বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তিযুক্ত কথা বলার।
শুরু হোক তবে নতুন জীবন নতুন নিয়মেই। সৃষ্টি হোক আইনের শাসন ও আইনের সঠিক ব্যবহার। অবশ্যই মুখ থুবড়ে পড়ুক আইনের মাথার উপর থেকে বেআইনের ছায়া।
অনন্য প্রতীক রাউত, শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট
Discover more from মত-প্রতিমত
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
