ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।
— ঈশ্বর, কাজী নজরুল ইসলাম।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের হিন্দু আইন: বিবাহ বিচ্ছেদের ছিন্নপত্র (প্রথম পর্ব)
বাংলাদেশের হিন্দু আইন: বিবাহ বিচ্ছেদের ছিন্নপত্র (দ্বিতীয় পর্ব)
বাংলাদেশের হিন্দু আইন: বিবাহ বিচ্ছেদের ছিন্নপত্র (তৃতীয় পর্ব)
বাংলাদেশের হিন্দু সমাজে পারিবারিক আইনের সংস্কার একটি দীর্ঘদিনের দাবি। বিশেষ করে নারী অধিকারের প্রশ্নে এই আইনের বিদ্যমান বৈষম্যগুলো আধুনিক সমাজে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ এই দাবিকে সামনে রেখে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ২০১০-২০১১ সনের দ্বি-বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় আইন কমিশন তাদের গবেষণায় কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে, যা হিন্দু নারীর উত্তরাধিকার ও বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ: নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন
বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার এবং বিবাহবিচ্ছেদ বিষয়ক বৈষম্য দূর করতে বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ দীর্ঘকাল ধরে আন্দোলন করে আসছে। এই সংগঠনটি ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এক দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে উত্তরাধিকার এবং বিবাহবিচ্ছেদে নারীদের বঞ্চিত করার অবসান ঘটাতে হিন্দু আইন সংস্কারে সরকারসহ সমাজের সর্বস্তরের সহযোগিতা কামনা করা হয়।
ওই বছরের ২৬ মে তারিখে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. ময়না তালুকদার লিখিত বক্তব্যে বলেন, হিন্দুপ্রধান দেশ ভারত, নেপাল ও মরিশাসের হিন্দু আইনে লিঙ্গবৈষম্য না থাকলেও বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু পারিবারিক আইনে নারী, প্রতিবন্ধী, দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি (নারী-পুরুষ উভয়ে) এবং লিঙ্গবৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
তিনি এই বৈষম্যকে ‘নির্মম’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “মানুষকে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সংবিধানে লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য না করার অঙ্গীকার রয়েছে। রাষ্ট্রকে এ অঙ্গীকার পালন করতে হবে। তাই আমরা রাষ্ট্রের কাছে এসব দাবি জানাচ্ছি।”
সভাপতি আরও বলেন, বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও বিভিন্ন আদিবাসী গোত্রের নারী, প্রতিবন্ধী, দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি ও লিঙ্গবৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ যাত্রা শুরু করে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত ১ বছর ৯ মাসের কার্যক্রমে তারা বৈষম্যমূলক হিন্দু আইনের ভুক্তভোগী এবং সমাজের বিবেকবান মানুষের কাছ থেকে অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা পেয়েছেন। তবে, হিন্দু সমাজের মধ্যেই গজিয়ে ওঠা কিছু মৌলবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন। এসব মহল তাদের আন্দোলনের সমর্থক ও সহকর্মীদের, বিশেষ করে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং নারীদের নানাভাবে হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অনলাইনে উত্ত্যক্ত করা, অশ্লীল গালাগাল, মিথ্যা প্রচারণা, কুৎসা রটনা এবং ধর্মীয় ও বংশপরিচয় তুলে অভব্য মন্তব্য ও ঘৃণা ছড়িয়ে চলেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, হিন্দু নারীদের সম্পর্কে ঢালাওভাবে বলা হচ্ছে, অধিকার দিলে তারা সনাতন ধর্মে থাকবে না; তারা সবাই ধর্মান্তরিত হবে। অধ্যাপক ময়না তালুকদার এই ধরনের প্রচারণাকে হিন্দু নারীদের প্রতি ঘৃণাবাচক, অসম্মানজনক ও নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “তারা যেকোনো মূল্যে নারীর অধিকার প্রতিহত করতে চায়। ধর্মের নামে এসব করা হলেও, এগুলো মূলত অধর্ম। এগুলো কোনো স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নয়; এগুলো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। কারও অধিকার হরণ গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মত হতে পারে না।”
আইন কমিশনের গবেষণা ও সুপারিশ
পরিবর্তনশীল সমাজের প্রয়োজন এবং বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের সার্বজনীন ধারণাকে সামনে রেখে অন্যান্য আইনের মতো হিন্দু পারিবারিক আইনের সংস্কারকে লক্ষ্য করে ২০১০-২০১১ সনের দ্বি-বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় তৎকালীন আইন কমিশন পারিবারিক আইনের পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণসহ গবেষণা কাজ করে। প্রচলিত হিন্দু পারিবারিক আইনের সংস্কারের জন্য আইন কমিশন সুপারিশ করে। এই সুপারিশগুলো তুলে ধরেন আইন কমিশনের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহ আলম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী-পুরুষ সমঅধিকারের বিষয়টি যুগ যুগ ধরে যেকোনো আইনী ব্যবস্থায় একটি নাজুক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নারী-পুরুষ সমানাধিকারের বিষয়টি আধুনিক মানবাধিকার আইনের একটি প্রধান লক্ষ্য। গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সে লক্ষ্য পূরণে সুপারিশগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ আইন করে অথবা বিষয়ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন আইন করে কার্যকর করা যেতে পারে। এরই অংশ হিসেবে হিন্দু পারিবারিক আইনের গবেষণা কাজ আরম্ভ হয়। এই গবেষণা প্রতিবেদনে হিন্দু পারিবারিক আইনের বর্তমান অবস্থা, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিবন্ধকতা এবং সংস্কারের পক্ষের ও বিপক্ষের ব্যক্তিদের যুক্তি তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় হিন্দু অধ্যুষিত ভারতের আইনী সংস্কার পর্যালোচনা করা হয়। আইন কমিশনের নিজস্ব এই গবেষণার অর্থায়নে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে পরিচালিত “Promoting Access to Justice and Human Rights in Bangladesh” প্রজেক্ট সহায়তা প্রদান করে। এই প্রজেক্টের অংশ হিসেবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সাথে আইন কমিশনের একটি সভা আহ্বান করা হয়। উক্ত সভা অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল হিন্দু আইনের সংস্কার বিষয়ে বেসরকারি সংস্থাগুলোর ইতোমধ্যেই পরিচালিত গবেষণার ফলাফল সংগ্রহ। উক্ত সভায় আইন ও সালিস কেন্দ্র, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, ব্র্যাক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তাদের মাঠ পর্যায়ের গবেষণার ফলাফল ও প্রস্তাবিত হিন্দু আইনের খসড়া সরবরাহ করে এবং এ বিষয়ে তাদের মতামত প্রদান করে। এর পাশাপাশি প্রচলিত হিন্দু আইন, পার্শ্ববর্তী দেশের সংস্কার এবং হিন্দু আইন সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আইনগুলো পর্যালোচনা করা হয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার লেখা সংগ্রহ করা হয় এবং প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে প্রশ্নমালা তৈরি ও বিতরণ করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর হিন্দু জনগোষ্ঠীর ২৫০ জনের নিকট প্রশ্নমালা প্রেরণ করা হয়, যাদের মধ্যে বিচারক, আইনজীবী, ছাত্র, গৃহিণী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও অন্যান্য পেশাজীবী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ২৪৬ জন উত্তরদাতা তাদের মতামত প্রেরণ করেন যা একত্রে সংকলন করা হয়।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তিনটি ফোকাস গ্রুপ আলোচনার আয়োজন করা হয়। উক্ত আলোচনায় হিন্দু আইনের সংস্কারের প্রয়োজন আছে কিনা বা সংস্কারে বাধা কোথায় বা কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার হতে পারে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত গ্রহণ করা হয়। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে একটি আলোচনাপত্র তৈরি করে জাতীয় কর্মশালায় আলোচনার জন্য তুলে ধরা হয়। উক্ত কর্মশালায় সংস্কারের পক্ষ-বিপক্ষের প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০০০ সালে আইন কমিশন হিন্দু আইনের সম্ভাব্য সংস্কারের ওপর একটি ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। একটি বিশেষ গবেষণাপত্র এবং তার ভিত্তিতে হিন্দু আইন সংস্কারের একটি খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছিল। তবে, এই গবেষণা ও খসড়া আইনগুলো রিপোর্ট আকারে কখনোই সরকারের নিকট প্রেরণ করা হয়নি।
বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ: আইন কমিশনের সুপারিশ
কমিশনের গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রচলিত সনাতনী হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদের অনুমোদন নেই। কারণ প্রথাগত আইনে হিন্দু বিবাহকে চুক্তি হিসাবে দেখা হয় না। বরং সকল ধর্মীয় ও জাগতিক কার্যসাধনের জন্য স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অবিচ্ছেদ্য বলে ধরা হয়। একান্তই স্বামীর সাথে বসবাসের উপায় না থাকলে বিবাহিত নারীর পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণের জন্য আইন আছে যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদের সমর্থন পাওয়া যায়। ঋষি নারোদ ও ঋষি পরাশর বিশেষ পরিস্থিতিতে পুনর্বিবাহের পক্ষে মত দেন, যেমন- স্বামী মারা গেলে, নিখোঁজ থাকলে, অক্ষম হলে, সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করলে অথবা ধর্মান্তরিত হলে পুনর্বিবাহ করা যাবে। যদিও স্পষ্টভাবে তারা বিবাহবিচ্ছেদের কথা বলেননি, তথাপি স্বামীর মৃত্যু ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ না করে পুনর্বিবাহের সুযোগ সামাজিকভাবেই ছিল না এবং তা বোধগম্য কারণে গ্রহণযোগ্যও নয়। তাছাড়া নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের প্রচলন ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
কমিশনের গবেষণায় আরও বলা হয়, যে ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আজীবন স্বামী-স্ত্রীর একত্রে বসবাসের কথা বলা হয় বা এমন পরিস্থিতি হতে পারে যেখানে একত্রিত থাকা কেবলমাত্র পরস্পরের মধ্যে তিক্ততাই বৃদ্ধি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে যে ক্ষেত্রে স্ত্রী নির্যাতনের শিকার হয়ে সংসার ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, সে ক্ষেত্রে পৃথক বসবাসের জন্য আইনী অধিকার আদায়ের পথ তার জন্য সহজ নয়। আবার এ অধিকার লাভ করলেও একাকী বসবাসের জন্য তার সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সম্পত্তির অধিকার না থাকায় পিত্রালয়ে বা ভ্রাতৃগৃহে স্বামী পরিত্যক্তা নারীর অবস্থান করা কঠিন হয়ে যায়। তাছাড়া স্বামী যখন এক স্ত্রীকে বিতাড়িত করে দ্বিতীয় বিয়ের মাধ্যমে সংসার ধর্ম পালন করতে থাকে, তখন প্রথম স্ত্রী স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে নিরাপত্তাহীন জীবন যাপন করতে থাকবে, এটি সুস্পষ্ট মানবাধিকারের লঙ্ঘন। স্বামীর অক্ষমতাজনিত যৌক্তিক কারণেও হিন্দু স্ত্রীদের বিবাহবিচ্ছেদের কোনো সুযোগ নেই।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বিবাহবিচ্ছেদের আইন হলে হিন্দু পরিবারে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে যাবে—এই যুক্তির অসারতা হলো স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সন্তান-সন্ততিসহ একত্রে বসবাস করবে এই ইচ্ছা থেকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিবাহবিচ্ছেদ কারও কাঙ্ক্ষিত নয় যদি না ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। বরং এ সংক্রান্ত কোনো আইনের অবর্তমানে অনেকে এফিডেভিটের মতো আইনগত ভিত্তিহীন উপায় বেছে নিচ্ছে। বস্তুত হিন্দু সমাজে বিচ্ছেদ না থাকায় কিছু হিন্দু নারী যে মানবেতর অবস্থায় জীবন যাপন করছে এ প্রসঙ্গে একাধিক গবেষণা হয়েছে এবং বিভিন্ন কেস স্টাডিতে বিষয়টি উঠে এসেছে। সুতরাং সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশী হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদের এবং পুনর্বিবাহের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।
আইন কমিশন সুপারিশে উল্লেখ করেন, ‘যে সমস্ত কারণে হিন্দু নারীর পৃথক বসবাসকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ কারণই বিবাহবিচ্ছেদের জন্য যুক্তিসংগত কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সুনির্দিষ্ট কারণে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে এই বিচ্ছেদ কার্যকর করা যেতে পারে। বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার পর উভয় পক্ষ পুনর্বিবাহ করতে পারবে’।
সূত্র: হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ বিষয়ক আইন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, ০৭ আগস্ট, ২০১২
জনমত জরিপ: আইন কমিশনের প্রশ্নমালা
আইন কমিশনের গবেষণায় “জরিপ ও পরিসংখ্যান” তুলে ধরা হয়। জরিপে নিচের প্রশ্নটি করা ৮০ ভাগ মানুষই হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের পক্ষে ভোট দেন।
প্রশ্ন: হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের সুযোগ থাকতে পারে কি?
- হ্যাঁ: ৮০%
- না: ১৫%
- মন্তব্য নেই: ০.৫%
গবেষণার সুপারিশ
যে সমস্ত কারণে হিন্দু নারীর পৃথক বসবাসকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ কারণই বিবাহবিচ্ছেদের জন্য যুক্তিসংগত কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সুনির্দিষ্ট কারণে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে এই বিচ্ছেদ কার্যকর করা যেতে পারে। বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার পর উভয় পক্ষ পুনর্বিবাহ করতে পারবে।
বহুবিবাহ
প্রচলিত হিন্দু আইনে বহুবিবাহ অনুমোদিত। অর্থাৎ বহুবিবাহ ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিতে অবৈধ নয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনেও শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু প্রাচীন আমলে বৈদিক যুগে এক বিবাহই সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম ছিল। কারণ তখন নারীরা খুবই সম্মানজনক এবং উঁচু অবস্থানে ছিলেন। পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার ভোগে নারী-পুরুষের মধ্যে বড় কোনো ব্যবধান ছিল না। স্ত্রীকে যথার্থই সহধর্মিণী বলা হতো।
আইনজীবী হিসেবে লেখকের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চিত্র
লেখকের কাছে অনেক সনাতনী পুরুষ ও নারী আসেন যারা উভয় পক্ষই অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে নানা রকমের অভিযোগ তুলে ধরেন। পুরুষের বিরুদ্ধে নারীর প্রধান অভিযোগ থাকে যৌতুক দাবি ও তার জন্য প্রহারের। তবে বেশ কিছু স্বামী স্ত্রীর বিরুদ্ধেও যৌতুকের অভিযোগ আনেন। এই ক্ষেত্রে পুরুষরা পুরুষ নির্যাতন আইন প্রণয়নের দাবি করেন। তারা বিভিন্ন বেসরকারি, বিশেষ করে মানবাধিকার ও নারী সংগঠনের সমালোচনা করে বলেন যে এ সব সংগঠন একচোখা, একদেশদর্শী। বাজার অর্থনীতির যুগে যেখানে পণ্য ভোগের দুর্মর বাসনা, সেখানে মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বজায় রাখা বেশিরভাগ লোকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলাফল কলহ-বিবাদ এবং নিষ্ঠুর বাস্তবতায় তারা বিবাহবিচ্ছেদের আইন না থাকা সত্ত্বেও সেদিক পানেই ধাবমান হন।
একইভাবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো স্বামী যদি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে চায়, সে ক্ষেত্রেও আইন না থাকার কারণে সে সফল হয় না। বিবাহবিচ্ছেদের বিরুদ্ধ পক্ষের যুক্তি হচ্ছে মুসলিম সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের প্রচলন থাকায় নারীরা নিরাপত্তাহীন জীবন বেছে নিয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদের কারণে শতকরা কতভাগ নারী বা শিশু অপরাধ জগতে প্রবেশ করছে তার কোনো পরিসংখ্যান বা প্রমাণ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়নি।
প্রকাশ বিশ্বাস, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফর বাংলাদেশ
লেখক, গবেষক ও আইনজ্ঞ
Discover more from মত-প্রতিমত
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
