আকাশে বিদ্যুৎজ্বলা বর্শা হানে
ইন্দ্রমেঘ;
কালো দিন গলির রাস্তায়।
কেঁদেও পাবে না তাকে অজস্র বর্ষার জলধারে।
— অমিয় চক্রবর্তী, বৃষ্টি
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের হিন্দু আইন: বিবাহ বিচ্ছেদের ছিন্নপত্র (দ্বিতীয় পর্ব)
জলধি এবং জলধর (ছদ্মনাম) দম্পতি বিয়ের পর থেকেই সংসারে একবিন্দু শান্তি-স্বস্তিও পাচ্ছেন না। তাদের সংসারে মেঘ কেটে কখনো সূর্যের হাসি ফোঁটে না। অসীম তমসে ভর করে থাকে তাদের জীবন। এই অশান্তির জন্য একপক্ষ অপর পক্ষকে দোষারোপ করে দায়ী করেন। দ্বন্দ্বের মাত্রা কখনো এতটাই তীব্র হয় যে খুন-জখমের পর্যায়েও চলে যায়। নীলা এবং নিলাদ্রী (ছদ্মনাম) দম্পতিরও একই অবস্থা। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা সনদধারী। আর সবাই বাংলাদেশি হিন্দু।
হিন্দু বিবাহ: পবিত্র বন্ধন নাকি আন্দামানে নির্বাসিত কারাগার
অথচ বিবাহ হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে পবিত্র বন্ধন। কোনো দলিল বা বৈধ কাগজ তার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। অন্যান্য দেশের হিন্দুদের মতো বাংলাদেশেও ধর্ম মতে বিবাহ একটি “সংস্কার” বা পবিত্র আচার যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চিরস্থায়ী বন্ধন তৈরি করে। এটি শুধুমাত্র পারিবারিক জীবনের ভিত্তি নয় বরং ধর্মীয় কর্তব্য পালনের মাধ্যম হিসেবেও দেখা হয়। ধর্মানুযায়ী বিবাহ একটি অটুট বন্ধন যা ভাঙা যায় না।
আমাদের দেশে এখানে সংশ্লিষ্ট প্রচলিত আইন নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে, শূন্য স্তব্ধতায় পড়ে আছে। আমাদের দেশের হিন্দু আইন দায়ভাগা মতে পরিচালিত হয়। Dayabhaga School অনুসারে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকের কোনো সুযোগ নেই। যখন যুদ্ধমান নারী ও পুরুষের ক্রন্দন থামানোর কোনো উপায় নেই, সংসার তখন আন্দামানে নির্বাসিত কারাগার।
বিচ্ছেদের কোনো পথ নেই
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা আদালতে হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে প্রচুর মামলার বিস্তার রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন শুধুমাত্র পৃথক বাসস্থানের অধিকার দেয়। আর ঐ পৃথক বসবাসের চরিত্র হবে—আলাদা শয্যা, আলাদা বসতঘর, পৃথক রান্না-উনুন (চুলা), আলাদা গৃহস্থালী তৈজস, আলাদা আহার। কিন্তু নারীকে ঐ স্বামীর পরিচয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে পরিচয় দিতে হবে। শাঁখা-সিঁদুর পরতে হবে।
এছাড়া পৃথক বসবাসের বেলায় হিন্দু বিবাহিতা নারীর রয়েছে ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকার। পুরুষের বেলায় এ অধিকার কল্পনাই করা যায় না।
বিবাহ বিচ্ছেদের হলফনামা: শুরুতেই বাতিল
বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু আইনে হিন্দু স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোনো বিবাহবিচ্ছেদ বা সেপারেশনের নিয়ম নেই, আইন নেই। এ বিষয়ে হলফনামা বা বিচ্ছেদের নোটিশ শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio)। হলফনামার মাধ্যমে বাংলাদেশে হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদ বা সেপারেশন চাওয়া যায় না। বাংলাদেশে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকে মৃত্যুর পরেও, কোনো কোনো ধর্মীয় মার্গ বিধান দেন যে এ সম্পর্ক হলো জন্ম জন্মান্তরের।
এসব উৎকট বাধা কাটাতে অন্যনূপায় হয়ে যুদ্ধমান নারী ও পুরুষ হলফনামার মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ চান। শুধুমাত্র অজ্ঞতার কারণে তারা এসব নিস্ফলা কর্ম করে থাকেন, যার কোনো আইনগত অর্থ নেই। আইনে বিবাহ বিচ্ছেদের বিধান না থাকায় নিজের অগোচরেই তারা ছোটেন কানাগলির আলেয়ার পেছনে ।
নোটিশ-পাল্টা নোটিশ
আমাদের কাল্পনিক চরিত্র জলধি আর জলধরের কাছে ফিরে যাই। সংসার নামক কুরুক্ষেত্র লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে এক পর্যায়ে জলধি পৃথক হয়ে যান স্বামীর কাছ থেকে। কিছুদিন পর স্বামীকে লিগ্যাল নোটিশ বা আইনি বিজ্ঞপ্তি পাঠান। আইনজীবীর মাধ্যমে তিনি লিখেন—
আমি জলধি, পিতা–জলোচ্ছল, মাতা–অমুক, বয়স–তমুক, ঠিকানা–… … …, পেশা–চাকুরি, ধর্ম–হিন্দু (সনাতন), জাতীয়তা–বাংলাদেশি, জাতীয় পরিচয়পত্র নং–… … …, এই মর্মে আপনাকে অত্র লিগ্যাল নোটিশের মাধ্যমে জানানো যাইতেছে যে, আপনার সহিত আমার বিগত … … … ইং তারিখে এক নোটারি পাবলিক এর মাধ্যমে বিবাহ হয়। ইতিমধ্যে আমাদের এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন, যার নাম– … … …, বয়স– … … বছর।
ইতোমধ্যে আপনার সহিত আমার বনিবনা না হওয়ার কারণে, আপনার সহিত দীর্ঘদিন পৃথক বসবাস করার কারণে এবং আপনি আমাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছেন বিধায় বিগত … … … তারিখে নোটারি পাবলিক, ঢাকা-এর আদালতে উপস্থিত হয়ে একটি সেপারেশন (Separation) এর হলফনাফা নোটারি করি, যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর … … …, তারিখ … … … (কপি সংযুক্ত)।
এমতাবস্থায় অদ্য নোটিশ প্রেরণের দিন হতে আপনার সঙ্গে আমার সকল বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করলাম এবং হিন্দু আইন অনুযায়ী আমি সেপারেশন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আমার গর্ভজাত কন্যাসহ বসবাস করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছি।
এরপর হতে আপনি আমার উপর স্বামী হিসাবে কোনো প্রকার আইনগত অধিকার রাখেন না এবং আপনার সঙ্গে আমার সকল বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।
আপনি আমার এবং আমার কন্যার যাবতীয় ভরণপোষণ প্রদান করতে বাধ্য বটে। অন্যথায় আমি আদালত যোগে ভরণপোষণ আদায়ের অধিকার সংরক্ষণ করি।
অত্র নোটিশ পাওয়ার ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে উত্তর দানে অবগত করিবেন, অন্যথায় আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করিব।
এর উত্তরে জলধর তার আইনজীবীর মাধ্যমে বলেন—
বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু আইনে হিন্দু স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোনো বিবাহবিচ্ছেদ বা সেপারেশনের নিয়ম নেই, আইন নেই। হলফনামা বা বিচ্ছেদের নোটিশ শুরু থেকেই অবৈধ। হলফনামার মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়া যায় না। বাংলাদেশে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকে মৃত্যুর পরেও এবং কেউ কেউ বিশ্বাস করেন এ সম্পর্ক জন্ম জন্মান্তরের। বাংলাদেশে শুধুমাত্র প্রচলিত রয়েছে পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণের, যা শুধুমাত্র স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে চাইতে পারেন। সেক্ষেত্রেও কয়েকটি শর্ত রয়েছে।
আইন ও শর্তগুলো হলো—
Hindu Married Women’s Right to Separate Residence and Maintenance Act, 1946 (ACT NO. XIX OF 1946) আইনের আওতায়, হিন্দু বিবাহিতা নারী নিম্নলিখিত কারণে স্বামীর কাছ থেকে পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণের দাবি করতে পারেন:
১. যদি স্বামী কোনো ঘৃণিত রোগে আক্রান্ত হন, যা স্ত্রীর দ্বারা সংক্রমিত হয়নি।
২. যদি স্বামী স্ত্রীর প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ করেন, যা স্ত্রীর পক্ষে তার সঙ্গে বসবাস করা অনিরাপদ বা অপ্রত্যাশিত করে তোলে।
৩. যদি স্বামী স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া বা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে পরিত্যাগ করেন।
৪. যদি স্বামী পুনরায় বিবাহ করেন।
৫. যদি স্বামী হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেন।
৬. যদি স্বামী গৃহে উপপত্নী রাখেন বা নিয়মিতভাবে উপপত্নীর সঙ্গে বসবাস করেন।
৭. যদি অন্য কোনো ন্যায্য কারণ থাকে।আপনি বিয়ের সময় আমার মক্কেলের পাওয়া সব রকমের উপঢৌকন যেমন স্বর্ণালঙ্কার, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আসবাবপত্র নিজের হেফাজতে আটকে রাখেন। আপনার লিগ্যাল নোটিশে যুক্ত হলফনামাটি আইনের চোখে অচল। ফলে আপনার দাম্পত্য সম্পর্ক আদতে ছিন্ন হয়নি। আপনি দাম্পত্য সম্পর্ক অস্বীকার করে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকারী নন। আপনার ওপর আমার মোয়াক্কেলের শতভাগ স্বামীর অধিকার বলবৎ রয়েছে।
সবশেষে, আমার মাধ্যমে আমার মোয়াক্কেল জনাব জলধর আপনাকে জানাচ্ছেন—জীবনের আয়ুস্কাল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। চোখের পলকে জীবন ফুরিয়ে যেতে থাকে। এইসব অপচেষ্টা ছেড়ে সংসারে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করুন।
এভাবে, নোটিশ পাল্টা নোটিশে সমস্যা যখন প্রকট হয়ে ওঠে তখন জলধী সেপারেশন চেয়ে মোকদ্দমা করেন জলধরের বিরুদ্ধে। বলাই বাহুল্য, এ মোকদ্দমার আরজিতে প্রায়শই থাকে বানোয়াট তথ্য। এমন নজিরও রয়েছে যে, মোকদ্দমার আরজিতে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত হবার মতো সর্বৈব মিথ্যাচার করা হয়।
বিচ্ছেদ নয় পৃথক বসবাস
নারী যার নামে সেপারেশন, তাঁকে কোনোভাবেই ‘ডিভোর্সি’ বলা যায় না। কারণ বাংলাদেশে হিন্দু আইনে ডিভোর্সের বা বিবাহবিচ্ছেদের কোনো বৈধ ব্যবস্থা নেই। যে দম্পতিরা স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে থাকছেন না, তারা শুধুমাত্র পৃথক বসবাসকারী স্বামী-স্ত্রী (Separate Living Couple)।
কিন্তু বর্তমান সময়ে আদালতপাড়ায় এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে হলফনামা বা সেপারেশননামা দেখিয়ে এটিকে ডিভোর্সের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করতে চান। অথচ সেটা আইনবহির্ভূত এবং কোনো অবস্থাতেই আইনসিদ্ধ নয়।
প্রকাশ বিশ্বাস, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফর বাংলাদেশ
লেখক, গবেষক ও আইনজ্ঞ
Discover more from মত-প্রতিমত
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

দারুণ লিখেছেন
Excellent dada.
Thank you.
Good article.
আপনাকে অফুরাণ ভালোবাসা জানাই। আপনি এ রকম অভাজনের লেখা পাঠ করছেন এ জন্য।
Really a good writing.
আপনার লেখা দুটি পর্বই পড়লাম। হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন হওয়া প্রয়োজন।আপনার সাথে আমি সহমত পোষন করছি।