বাংলাদেশের হিন্দু আইন: বিবাহ বিচ্ছেদের ছিন্নপত্র (তৃতীয় পর্ব)

বাংলাদেশের হিন্দু আইন: বিবাহ বিচ্ছেদের ছিন্নপত্র

“ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে?

মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া।”

— উটপাখি, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

যে সম্পর্ক ভিত্তিহীন হয়ে গেছে, যেখানে আর কোনো বিকাশ বা পুনর্জন্ম সম্ভব নয়, সেখানে শুধুই দুঃখ পুষে রাখা বৃথা। ভ্রান্তির জোড়াতালি দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। সংসার নামক ফুলবাগানে যখন দৈত্য আসে, যখন সকল পুষ্প দলিত করে দেয়, তখন সে বাগান পরিত্যক্ত ঘোষণাই অনিবার্য হয়ে পড়ে। তখন পলায়নই উত্তমর্ণ কর্মরূপে বিবেচিত হওয়া উচিত। বিয়োগে বিয়োগে শেষপর্যন্ত যোগ হয়— আর সেই যোগফল হয় স্বাধীনতার, মুক্তির।

বাংলাদেশের হিন্দু নারীর জীবনে বিবাহ এক অচঞ্চল চুক্তি— তা রচিত হলে বাতিলের কোনো পথ থাকে না। এমনকি যদি সংসারে নিপীড়ন, ত্যাগ, অবহেলা, কিংবা পতির অনুপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবুও রাষ্ট্রীয় আইনে তাঁর জন্য নেই কোনো স্বীকৃত বিচ্ছেদপথ। এই অনুপস্থিত আইন শুধু এক ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি এক সাংবিধানিক সংকটও বটে।

যখন ধর্ম ও আইন দু’দিক থেকেই নীরবতা নেমে আসে, তখন কারও কারও জীবনে নেমে আসে এক অন্তহীন কারাবাস। আমি বলছি সেইসব মানুষের কথা, যাঁরা জন্মসূত্রে হিন্দু, নারী অথবা পুরুষ এবং এই সমাজে ভোগ করেন নিঃশব্দে কারাবাস।

ধর্মে সংসার না হোক কংসের কারাগার

বিবাহ সংস্কার যেহেতু ধর্ম— ধর্ম শুধুমাত্র আচার নয়, ন্যায়বোধেরও ভাষ্য। ‘ধর্ম’ শব্দটি এসেছে ‘ধৃ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ ধারণ করা। অথচ হিন্দু নারীর জীবনে ধর্ম যেন ধারণ করে কেবল কর্তব্য— অধিকার নয়।

ব্রাহ্মণ্যবাদীরা প্রায়শই বলেন, “হিন্দু ধর্মে বিচ্ছেদ নেই”— এটি এমন এক উক্তি, যেটি শাস্ত্রীয় রেফারেন্সের চাইতেও বেশি এক কর্তৃত্বের ছায়া বিস্তার করে।

মনু কিংবা যাজ্ঞবল্ক্য— প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রের যে ব্যাখ্যা আছে, তা মূলত ব্রাহ্মণ্যপন্থী পুরুষতন্ত্রের রচনায় রচিত। অথচ হিন্দুধর্মের আর এক প্রবাহ— উপনিষদের অন্তর্জগৎ, গীতার করুণা, বা বাউল-ভক্তি সাহিত্য— মানবিক সম্পর্ককে গীতির, মুক্তির, আত্মার উন্নতির পথে দেখে। সেখানে জোর নেই, আছে চেতনা; কারাবাস নয়, মুক্তির পথ।

আইনের নির্ভরতা নয়, আছে শুধু ব্যক্তিগত দায়

আইন—সে তো সমাজের বিবেক। হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কিত আইনের প্রশ্নে, রাষ্ট্র যে দায় এড়াতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা আছে—”আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী হইবে।” তাহলে হিন্দু নারীর এই অধিকার কোথায়?

মুসলিম, খ্রিস্টান, এমনকি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের আইনি ব্যবস্থা থাকলেও হিন্দু নাগরিকের এখনও নেই কোনো নাগরিক নির্ভরযোগ্যতা; তাদের জীবনের ক্লান্তি, অপমান, নিঃসঙ্গতা— কেবল একান্ত ব্যক্তিগত দায়।

সংস্কার মানেই আঘাত নয়

হিন্দু আইন সংস্কার করা মানে হিন্দু ধর্মকে আঘাত করা নয়— বরং তা ধর্মের অন্তর্নিহিত ন্যায় ও সহমর্মিতার মর্মকেই প্রতিষ্ঠা করা। ধর্ম যদি করুণা শেখায়, রাষ্ট্রের উচিত সেই করুণাকে রূপ দিতে নাগরিক অধিকারে।

সংকটের সমাধান কঠিন নয়, যদি রাষ্ট্র ও সমাজ অন্তর দিয়ে চায়। বাংলাদেশ সরকার চাইলে, একটি পরিপূর্ণ ‘হিন্দু বিবাহ ও বিচ্ছেদ আইন’ রচনা করা সম্ভব। এই আইনে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান সুযোগ থাকতে পারে বিবাহের বন্ধন ছিন্ন করার। আইনে এটিকে বাধ্যতামূলক না রেখে, ঐচ্ছিক রাখা যেতে পারে— যারা চান, তাঁরা প্রথামাফিক চলতে পারেন; কিন্তু যারা মুক্তির পথ খুঁজছেন, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় আশ্রয় থাকা জরুরি।

হিন্দু নাগরিকের অধিকার এখনো যেন এক অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা। বিবাহ যদি পবিত্র হয়, তবে তা বল প্রয়োগের নয়, সম্মতির বন্ধন হোক। যদি সে সম্মতি আর না থাকে, তাহলে বিচ্ছেদও হোক সম্মানের পথ। ধর্ম আমাদের শিখিয়েছে মুক্তি— রাষ্ট্রের উচিত সেই মুক্তিকে আইনরূপে প্রতিষ্ঠা করা।

হিন্দু নাগরিকের জন্য বিচ্ছেদ আইন শুধু একটি অধিকার নয়; এটি এক নৈতিক দায়, এক সাংবিধানিক ঋণ। এই ঋণ শোধ না হলে, আমরা কেউই সত্যিকার অর্থে মুক্ত নই।

ঐতিহাসিক বিষাদ ও রাষ্ট্রের অনীহা ভাঙতে কড়া নাড়ছে সময়

উনিশ শতকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রশাসন হিন্দুদের বিবাহ আইন স্পর্শ করেনি। সে সময় হিন্দু সমাজকে ‘শুদ্ধ’ রাখার নামে হস্তক্ষেপ এড়িয়ে গেছে তারা। সেই ধারা চলেছে পরবর্তীকালে পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশেও।

ভারতে যদিও ১৯৫৫ সালে হিন্দু বিবাহ আইন এবং ১৯৫৬-তে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন পাস হয়েছে, বাংলাদেশে এই সংস্কার হয়নি।

বিচ্ছেদ আইন নিয়ে যতবার প্রস্তাব এসেছে, তা ধর্মীয় নেতৃত্বের চাপেই থেমে গেছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণা তখন যেন হারিয়ে যায় পণ্ডিত ও পুরোহিতদের উচ্চারণের জটে। অথচ এই নীরবতা শুধু এক ধর্মীয় সংকোচ নয়, রাষ্ট্রের সংবিধানবিরোধী অবস্থানও বটে।

“তোমরা যাহা নিয়ম বল, আমি তাহাই ভাঙিতে এসেছি।”

অচলায়তন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে, বিশেষ করে উনিশ শতকে, প্রশাসনিক ও আইনি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে বহু বিধিবদ্ধ আইনের সূচনা হয়— যেমন দণ্ডবিধি, ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যবিধি। তবে ব্রিটিশরা ব্যক্তিগত আইন— যা মূলত ধর্ম ও প্রথা থেকে উৎসারিত— সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করে। ব্যক্তিগত আইনগুলো প্রায়শই বৈষম্যপূর্ণ, পীড়নমূলক ও পিতৃতান্ত্রিক চেতনায় রচিত, যার প্রধান ভুক্তভোগী ছিলেন নারীরা।

এই নীরবতার মূল কারণ ছিল উপনিবেশিক শাসকের মুনাফা সর্বোচ্চকরণে আগ্রহ এবং স্থানীয় ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ‘পিতৃতান্ত্রিক ঐক্য’র সাথে দ্বন্দ্ব এড়ানো। তবুও, কিছু প্রগতিশীল ব্যক্তির প্রচেষ্টায় হিন্দু ব্যক্তিগত আইনে আংশিক সংস্কার সাধিত হয়— যেমন সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধকরণ (রাজা রামমোহনের নেতৃত্বে) এবং হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে)। ১৮৭২ সালে পাশ হয় বিশেষ বিবাহ আইন।

তবে সার্বিকভাবে বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, পুনর্বিবাহ, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার ও দত্তক সম্পর্কিত হিন্দুদের আইন আজও প্রথাগত ধর্মীয় শাস্ত্রের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও ১৯৭১-এ স্বাধীনতা অর্জনের পরও, বাংলাদেশের হিন্দু পারিবারিক আইনগুলোতে কোনো মৌলিক সংস্কার হয়নি। বিশেষ করে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত কোনো আইন এখনও প্রণীত হয়নি। অথচ ভারতের মতো রাষ্ট্রে ১৯৫৫ সালেই হিন্দু বিবাহ আইন পাশ হয়েছে, যেখানে বিবাহ বিচ্ছেদ আইনি বৈধতা পেয়েছে। এমনকি হিন্দু রাষ্ট্র নেপাল, মরিশাসেও বিবাহ বিচ্ছেদের আইন রয়েছে।

বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ২০১২ সালে ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন’ প্রণীত হলেও তা ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে, যার ফলে কার্যত আইনটির বাধ্যবাধকতা নেই। একই বছর বাংলাদেশ আইন কমিশন ‘হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কার’ বিষয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে বিবাহ বিচ্ছেদ, পুনর্বিবাহ, নারীর সম্পত্তিতে অধিকার, ভরণপোষণ ও সন্তানের অভিভাবকত্বসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, জনমত জরিপে দেখা যায়— ৮০% মানুষ হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের পক্ষে মত দিয়েছেন।

তাই আর বিলম্ব নয়— আমাদের দেশে এখনই জরুরি সনাতনীদের বিবাহ আইন সংস্কার, বিচ্ছেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার।

প্রকাশ বিশ্বাস, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফর বাংলাদেশ
লেখক, গবেষক ও আইনজ্ঞ

Discover more from মত-প্রতিমত

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

One thought on “বাংলাদেশের হিন্দু আইন: বিবাহ বিচ্ছেদের ছিন্নপত্র (তৃতীয় পর্ব)

একটি মন্তব্য করুন ⤵️

×
পরামর্শ প্রয়োজন? এখানে চাপুন!