হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজও চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো—বুড়ি চাঁদটারে আমি ক‘রে দেবো
কালীদহে বেনোজলে পার;
আমরা দু-জনে মিলে শূন্য ক‘রে চ‘লে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।
— জীবনানন্দ দাশ, আট বছর আগের একদিন
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের হিন্দু আইন: বিবাহ বিচ্ছেদের ছিন্নপত্র (প্রথম পর্ব)
জলধর আর জলধি, নীলা আর নিলাদ্রীরা আগেও ছিলেন। ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া ধূসর দিনগুলোতে তাঁদের মতো অনেকেই ছিলেন। পৌরাণিক ইতিহাসে ভূলোক, উর্দ্ধলোকের অনেকের ক্রিয়াকলাপ, আচরণে দ্বন্দ্ব ছিল; ছিল যুগল প্রেমের বিপরীতে অন্ধকারও।
হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক; অতএব বিবাহের কোন পক্ষ অপরের সাথে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে না, যদি তা প্রথাগতভাবে সিদ্ধ না হয়। এমনকি স্ত্রী যদি বহুগামী হন, তারপরও না। অপরদিকে স্বামী যদি দুঃশ্চরিত্রও হন, তাহলেও সতী-লক্ষ্মী নারীর সেই দুঃশ্চরিত্র স্বামীকে নিয়েই ঘর করতে হবে।
অবশ্য নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের কিছু নজির পাওয়া যায়। নারদ ও কৌটিল্যের গ্রন্থসমূহে হিন্দু সামাজিক প্রথার কিছু ক্ষেত্রে পুনর্বিবাহের উল্লেখ আছে। নারদের মতে, স্বামীর অবর্তমানে, মৃত্যু বা যৌন অক্ষমতার জন্য হিন্দু মহিলাদের মধ্যে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের রেওয়াজ ছিল। অবশ্য মনু তা স্বীকার করেননি। স্মৃতির যুগে দেখা যায়, কোনো কোনো শাস্ত্রকার বিশেষ ক্ষেত্রে স্ত্রীদের বিবাহবিচ্ছেদের বিধান দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে পরাশরের বিখ্যাত শ্লোকটি উল্লেখযোগ্য:
नष्टे मृते प्रव्रजिते क्लीने च पतिते च।
पञ्चेषु आपत्सु नारिणां पतिरन्यो विधीयते।।
বাংলা উচ্চারণ:
“নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীনে চ পতিতে চ।
পঞ্চেষু আপৎসু নারিণাং পতিরন্যো বিধীয়তে।।
অর্থ: স্বামী যদি নিখোঁজ (নষ্টে), মারা যায় (মৃতে), সন্ন্যাসী হয় (প্রব্রজিতে), অক্ষম হয় (ক্লীনে), বা পতিত হয় (পতিতে)— এই পাঁচ বিপদের মধ্যে নারীর জন্য অন্য স্বামী গ্রহণের বিধান আছে।
যদিও আধুনিক হিন্দু পারিবারিক আইনে (বিশেষত ১৯৫৫ সালের Hindu Marriage Act) বিবাহবিচ্ছেদ একটি আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে, তবে হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্য, মহাকাব্য, স্মৃতি ও পুরাণে দাম্পত্য বিচ্ছেদ, নারীর পুনর্বিবাহ এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতার নানা দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ সকল দৃষ্টান্ত নারীর অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টিকে প্রাচীন ধর্মীয় পাঠ্যেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যা বর্তমান আইনি ও সামাজিক আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক।
বাল্মীকি রামায়ণে সীতাকে অগ্নিপরীক্ষার পরেও জনসাধারণের সন্দেহের কারণে রাম ত্যাগ করেন, যদিও তিনি ছিলেন নিষ্পাপ। এটি কোনও আইনি বিচ্ছেদ নয়, তবে এটি দাম্পত্য বিচ্ছিন্নতার একটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক প্রতিফলন। এই দৃষ্টান্ত নারীর প্রতি সামাজিক অবিচার ও “public morality”-র নামে দাম্পত্য বিচ্ছেদের একটি নিদর্শন হিসেবে প্রাসঙ্গিক।
মহাভারতে দ্রৌপদীর অপমান ও স্বামী কর্তৃক দায়িত্বহীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। যুধিষ্ঠির পাশা খেলায় দ্রৌপদীকে হারানোর পর সভায় তাঁকে হেনস্থা করা হয়। দ্রৌপদী সেই সময় প্রশ্ন তোলেন—তিনি কি নিজেই নিজের অধিকারসম্পন্ন, নাকি কেবল পণ্যের মতো? স্বামী কর্তৃক অপমানিত হওয়ার পরও দ্রৌপদী দাঁড়িয়ে নারীর মর্যাদার দাবি করেন।
নারদ স্মৃতিতে নারীর বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ সম্পর্কে বলা হয়েছে, যদি স্বামী নিখোঁজ, পঙ্গু, ধর্মচ্যুত বা গৃহত্যাগী হন, তবে স্ত্রী নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষার পর অন্যত্র বিবাহ করতে পারেন।
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী, কোনো নারী যদি স্বামীর দ্বারা অন্যায়ভাবে অবহেলিত হন, তবে তিনি আইনত নিজ অধিকার আদায় করতে পারেন—যেমন স্ত্রীধনের পুনরুদ্ধার এবং প্রয়োজনে স্বামীর সংসার ত্যাগের অনুমতি (Arthashastra 3.3; Kangle, 1965; Olivelle, 2013)। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা বলেন, এই অনুমতির জন্য নারীরা রাজা বা শাসনকর্তার কাছে যেতে পারতেন।
পুরাণ ও উপনিষদীয় সাহিত্যে দেখা যায়, অনেক ঋষিপত্নী তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে স্বামী ত্যাগ করেন বা স্বতন্ত্রভাবে জীবনযাপন করেন।
মহাভারতে উলূপী অর্জুনকে কিছুদিন সঙ্গ দেন, পরে নিজ জীবনে ফিরে যান।
পৌরাণিক কাহিনীতে দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে ভুলে যান এবং বহুদিন পর তাঁদের মিলন হয়; এই বিচ্ছিন্নতা দাম্পত্য দায়িত্বের ব্যত্যয় হিসেবে বিবেচনায় আনা যায়।
শতপথ ব্রাহ্মণ এবং অথর্ববেদে স্ত্রী ও স্বামীর পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে। সেখানে স্ত্রীর প্রতি সহিংসতা বা অবহেলা হলে সম্পর্ক ভাঙনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে দেখা যায়, সন্ন্যাস গ্রহণের পরে স্ত্রীর সংসার ত্যাগ গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেমন দত্তাত্রেয় বা ঋষিগণের ক্ষেত্রে। যদিও এটি স্বামীর অধিকার ছিল, নারীর পক্ষেও পৃথক জীবনের নজির কখনো কখনো উঠে এসেছে।
এইসব কাহিনি ও স্মৃতি প্রমাণ করে যে, হিন্দু ধর্মে বিবাহবিচ্ছেদ বা দাম্পত্য বিচ্ছিন্নতা কোনো নতুন ধারণা নয়। বরং, শাস্ত্র ও সাহিত্যে বিশেষ পরিস্থিতিতে নারীকে পৃথক হওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। এটি বোঝায় যে, আধুনিক আইনে বিবাহবিচ্ছেদকে “অহিন্দু” বা “অধার্মিক” বলা সঠিক নয়, বরং এর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে ধর্মীয় সাহিত্যে।
ব্রিটিশ শাসনামলে প্রবর্তিত আইনে বলা হয়েছে, কোনো হিন্দু যদি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং সে কারণে তার স্বামী কিংবা স্ত্রী যদি পরিত্যক্ত বা প্রত্যাখ্যাত হন, তবে ধর্মান্তরিত ব্যক্তির আবেদনক্রমে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘোষণা করা যেতে পারে এবং পুনর্বিবাহও করতে পারেন। তবে, এই আইনটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়।
বেশ কিছু শাস্ত্র হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদকে অশ্রদ্ধা করতে দিকনির্দেশনা দেয়। একই সঙ্গে কিছু ধর্মীয় সংগঠন হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদের ওপর নানা রকম আপত্তিও উত্থাপন করে। তবে এর বিরুদ্ধে পরাশর সংহিতা সরাসরি বিধান দেয়। পরাশর সংহিতায় বলা হয়েছে, স্বামী যদি নিরুদ্দেশ হন, মারা যান, প্রব্রজ্যা অবলম্বন করেন (অর্থাৎ সন্ন্যাসী হয়ে যান), ক্লীব (পুরুষত্বহীন) হন অথবা পতিত (ধর্ম বা সমাজ থেকে বিচ্যুত) হন—এই পাঁচ প্রকার বিপদ উপস্থিত হলে নারীর জন্য অন্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া বিধেয়। গরুড় পুরাণের প্রথম খণ্ডের ১০৭ নম্বর অধ্যায়ের ২৮ নম্বর শ্লোকেও হুবহু একই কথা বলা হয়েছে।
পতিভক্তি প্রদায়িনী
পতিভক্তি প্রদায়িনী”-তে শ্রী রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত বলেন,
“পতি যদ্যপি অতিশয় পাপকর্ম্মে রত হয়েন, তথাপি পত্নী নিজ পতিকে অতিপবিত্র জ্ঞান করিবেন। স্ত্রীলোকেরা এই বোধ করিবেন— যেমন অগ্নি সর্ব্বভক্ষ্য হইয়াও কোন দোষে দূষিত হয়েন না, সেইরূপ আমার স্বামী সাক্ষাৎ পরমেশ্বর; ইনি বিধি-নিষেধের অতীত, কোন দোষে দূষিত নহেন। পতিব্রতা নারী এইরূপে বিষ্ণুবুদ্ধি করিয়া নিরন্তর পতিশুশ্রুষাতে নিযুক্তা থাকিবেন।
সদ্বংশজাতা যে সাধ্বী স্ত্রী, তাঁহার একশত পুত্র হইতেও পতিই অধিক অর্থাৎ স্নেহপাত্র। যে স্ত্রী অসদ্বংশজাতা হয়, সেই স্ত্রী পিতা-মাতার দোষে দূষিতা ও দুঃশীলা এবং জ্ঞানবর্জিতা হইয়া স্বামীকে মান্য করে না। স্বামী যদ্যপি কুৎসিত বা পতিত, মূঢ়, দরিদ্র, রোগী ও জড় (হিতাহিতবোধরহিত) হন, তথাপি সৎকুলজাত স্ত্রীলোকেরা নিজ কান্তকে বিষ্ণুতুল্য দর্শন করিবেন।
স্বামী সন্তানপ্রাপ্তির ও বংশবৃদ্ধির কারণ হইয়াছেন। পতিব্রতা পত্নীর দ্বারা ইহঁলোক ও পরলোক জয় করা যায়। পতিব্রতা পত্নী-রহিত যে পুরুষ, তিনি দেবপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ ও অতিথিসেবা আদি কর্মে সিদ্ধিলাভ করিতে পারেন না। যাহার গৃহে পতিব্রতা পত্নী বর্তমানা আছেন, তাঁহাকেই গৃহস্থ বলা যায়। যে ব্যক্তি দুঃশীলা অপ্রিয়বাদিনী কামিনীকে পরিণয় করিয়াছেন, তিনি জরারাক্ষসীগ্রস্ত মনুষ্যের ন্যায়; সেই দুষ্টা নারীর করাল কবলে প্রতিপদে পতিত হয়েন।
পুরুষ শত শত দোষে দূষিত হইলেও নিজ পরিণীত সাধ্বী সীমন্তিনীর সৌভাগ্যবলে কুকর্ম্মসকলের ফলভাগী না হইয়া স্বর্গসুখ সম্ভোগ করেন। অতএব পতিব্রতা পত্নীই পুরুষের পক্ষে স্বর্গসোপান হইয়াছেন— ইহা পূর্বে উক্ত হইয়াছে। পত্নী যদি দুঃশীলা হয়, তবে সেই পত্নী পরলোকে পতির প্রতি সাক্ষাৎ নরকের দ্বারস্বরূপা এবং ইহলোকে মনস্তাপ ও অযশের বীজস্বরূপা হয়। অতএব পুরুষের পক্ষে স্বর্গ-নরক, সুখ-দুঃখের নিদান পত্নীই হইয়াছেন। এই হেতু পত্নীর স্বধর্ম্মাচরণবিষয়ে ও ধর্মশিক্ষাবিষয়ে পতি অধীশ্যই সাবধান হইবেন।
অপিচ, বিধাতা এই পতি-পত্নীসম্বন্ধ যাহা নিরূপিত করিয়াছেন, জন্ম পরিবার্ত্ত হইলেও সেই সম্বন্ধ পরিবার্ত্ত হয় না; বিধাতা যে নারীকে যে পুরুষের পত্নী নিরূপিত করিয়াছেন, প্রতি জন্মে সেই কামিনী সেই পুরুষেরই পত্নী হইবেন; ইহা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের জন্মখণ্ডে উক্ত হইয়াছে।
যথা:
‘সৰ্বা হি স্বপ্রিয়ং লব্ধং লভন্তে জন্মনি জন্মনি।
তজ্জন্ম পতিলাভার্থং সৰ্বা: স্ত্রিয়োইভিজন্মনি॥’
“পতিভক্তি প্রদায়িনী”-তে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদকে ধর্মবিরোধী, ইহলোক-পরলোকবিরোধী ও অধর্মাচরণ বলে সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে। একে অর্ধাঙ্গভঙ্গ ও পাপকার্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
(পতিভক্তি প্রদায়িনী— শ্রীশ্রীমতি বর্দ্ধমানাদি মহামহীন্দ্রমহিষীর আদেশানুসারে শ্রীযুক্ত রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত কর্তৃক সঙ্কলিত ও শ্রীযুক্ত তারকনাথ তত্ত্বরত্ন কর্তৃক আলোচিত, বর্দ্ধমান যন্ত্রে মুদ্রিত।)
ইসকন প্রভুর অবস্থান বিবাহ বিচ্ছেদের বিপক্ষে
ইসকন (আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ) এর একজন প্রভু ব্রজানন্দ কৃষ্ণ দাস বলেন,
“পতিব্রতা নারীর লক্ষণ কী কী? ৯৯% নারী জানে না সেই কার্য। স্বকীয়া ভাব – যাহাকে বিধানে বিবাহ করা হইয়াছে। যে পতিব্রতা ধর্মে স্থিতা ও স্বামীর আজ্ঞানুবর্তিনী, সেই ভাবকে স্বকীয়া ভাব বলে। পরকীয়া – যে রমণী ইহলোক বা পরলোক সম্বন্ধীয় বিসর্জন পূর্বক আসক্তিতে পরপুরুষের কাছে আত্মসমর্পণ করে, যে নারী ধর্ম অর্থাৎ বিবাহ বিধি অনুসারে গৃহীত নহেন, তাহাকে পরকীয়া বলে। যা ৯৯% নারী জানে কি না সন্দেহ আছে। নারীর ধর্ম পালনের মার্গ: সবার আগে এটা মনে রাখতে হবে যে, স্ত্রীর কাছে স্বামীর থেকে বড় ভগবান আর কেউ হতে পারে না। তার নিজের স্বামীকে ছাড়া কোনো সাধু, মহাত্মা, দেবতা অথবা পূজা করার দরকার হয় না। স্ত্রীর প্রধান কর্তব্য একটাই হয়, যে সে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে কেবল সেই কার্যই করুক যাতে তার স্বামীর কল্যাণ হয়। এটাই তার পূজা, এটাই তার তপস্যা। শাস্ত্রে নারীর জন্য স্বামী-সেবা ছাড়া আর কোনো তপস্যার বিধান নেই। যে স্ত্রী মন, বচন এবং কর্ম দ্বারা পূর্ণ পতিব্রতা হয়, তার অন্য কারো আশীর্বাদের প্রয়োজন হয় না; দেবতাও তাকে ভয় পায়।আর ভগবান স্বয়ং তার আজ্ঞাধীন হন।
স্বামীর কর্তব্য পালনে স্ত্রীকে তার সহকর্মী হতে হয়। তাকে সঙ্গ দিতে হয়। স্ত্রীর উচিত স্বামীর মাতাপিতাকে নিজের মাতাপিতা মান্য করে সম্মান করা। তাদের সেবাই সব থেকে উত্তম ধর্ম। নীতিশাস্ত্রে বলা হয়েছে, রাজা ও স্বামীর সঙ্গে তার মন বুঝে কথা বলতে হয়। অসময়ে যদি ভালো কথাও বলা হয়, তার পরিণামও ভালো হয় না। সবশেষ এটাই বলি, শ্বশুরবাড়িকেই নিজের বাড়ি মনে করা। সেখানে থেকে নিজের বাপের বাড়ির প্রশংসা না করা। এখানে এমনভাবে থাকো যাতে তুমি নিজের বাপের বাড়িকেও ভুলে যাও। আপন ইচ্ছায় পরপুরুষকে স্পর্শ করা পতিব্রতা ধর্মের বিরুদ্ধ। আগে স্বামী, তার পরে সন্তান—এটাই মহান আদর্শ। স্বামীকে পরিত্যাগ স্ত্রীর পক্ষে ভারি নিন্দার ব্যাপার।
… রাজা ও স্বামীর সঙ্গে তার মন বুঝে কথা বলতে হয়। অসময়ে যদি ভালো কথাও বলা হয়, তার পরিণামও ভালো হয় না। সবশেষ এটাই বলি, শ্বশুরবাড়িকেই নিজের বাড়ি মনে করা। সেখানে থেকে নিজের বাপের বাড়ির প্রশংসা না করা। এখানে এমনভাবে থাকো যাতে তুমি নিজের বাপের বাড়িকেও ভুলে যাও। আপন ইচ্ছায় পরপুরুষকে স্পর্শ করা পতিব্রতা ধর্মের বিরুদ্ধ। আগে স্বামী, তার পরে সন্তান—এটাই মহান আদর্শ। স্বামীকে পরিত্যাগ স্ত্রীর পক্ষে ভারি নিন্দার ব্যাপার।”
বিবাহ সম্পর্কিত শাস্ত্রীয় বিধান
ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণ, সামবেদে উল্লেখিত সংস্কৃত ভাষায় হিন্দু বিবাহের মন্ত্র হলো—
यदेतद्धृदयं तव तदस्तु हृदयं मम।
यदिदं हृदयं मम तदस्तु हृदयं तव॥
বাংলা উচ্চারণ:
যদেতদ্ধৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব॥
অর্থ: যদি এই হৃদয় তোমার হয়, তবে তা আমার হৃদয় হোক।
যদি এই হৃদয় আমার হয়, তবে তা তোমার হৃদয় হোক।
এহেন পবিত্র মন্ত্র দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর দেহ এবং রক্ত-মাংস এবং পরস্পরের অস্থিসমূহ এক বলে গণ্য করা হয়। হিন্দু পণ্ডিতদের মতে, “বিবাহ বন্ধনই হলো নর-নারীর একমাত্র আত্মশুদ্ধির উপায়।”
বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে একজন তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সকল প্রকার কালিমাকে মুছে ফেলে দেহ ও মনকে পবিত্র ও সতেজ করে তুলতে সহায়তা করে।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে বলা আছে যে, যখন স্বামী সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, তখন স্ত্রীর উচিত—ঘরে ফিরে গিয়ে উপাসনামূলক, নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করা, সন্তান বা পরিবারে ধ্যানের আদর্শ স্থাপন করা।
পৃথু রাজা বানপ্রস্থে যাওয়ার পর তার স্ত্রী অর্চি বানপ্রস্থ আচার মেনে কঠোর উপবাস, তপস্যা ও সংযমের মাধ্যমে সাধ্বীজীবন যাপন করতে থাকেন। চৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাস গ্রহণের পরও তার স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া স্ত্রী হিসাবে নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রকারগণ মনে করেন, এটি “বিচ্ছেদের অধিকার” হিসেবে নয়—বরং “স্বামীর সন্ন্যাস গ্রহণের পর স্ত্রীর স্বাবলম্বী, নিয়ন্ত্রিত ও আদর্শ জীবন পরিচালনাকে নির্দেশ করে।
এমন বিধান বৈদিক অন্যান্য শাস্ত্রগ্রন্থেও আছে। ইংরেজরা হিন্দু আইন বানানোর সময় এই ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। কিন্তু ধর্মের বিধানকে উপেক্ষা করে তৎকালীন ভারতবর্ষের সামাজিক প্রথা এবং রঙ্গশালায় নটী ও ঘরে রক্ষিতাপালক সামন্তপ্রভুদের এবং তাদের সহযোগী পণ্ডিত শ্রেণির সমর্থনে অবিভাজ্য বিয়ের বিধান যুক্ত করে হিন্দু আইন বানিয়েছিল।
সমাজ সংস্কারক ও মনীষিদের অভিমত
ইতিহাসবিদ, নৃতত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানী অতুল সুর তার গবেষণা পুস্তক “ভারতের বিবাহের ইতিহাস”-এ বলেন,
“হিন্দুসমাজে উচ্চবর্ণের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তার কারণ, হিন্দুর দৃষ্টিভঙ্গীতে বিবাহ ‘চুক্তি’ বিশেষ নয়। এটা হচ্ছে একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং বিশুদ্ধিকরণের জন্য দ্বিজাতির মধ্যে যে দশবিধ সংস্কার আছে, বিবাহ তার মধ্যে শেষ ও চরম সংস্কার। এই সংস্কার দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
১৯৫৫ সালে হিন্দু বিবাহ আইন প্রণীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বামী দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করতে পারতেন। কিন্তু সে কারণে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হতো না। এক কথায়, সনাতন হিন্দুসমাজে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক কখনও প্রত্যাহৃত হবার অবকাশ ছিল না, তবে স্ত্রী ব্যভিচারিণী হলে তাঁকে সমাজ থেকে বহিষ্কৃত করে দেওয়া হত এবং স্ত্রী হিসাবে তিনি তাঁর পূর্বমর্যাদা হারাতেন।কিন্তু উত্তর ভারতের নিম্নজাতির মধ্যে ও দক্ষিণ ভারতের কোনো কোনো উচ্চ ও নিম্নজাতির মধ্যে, বিশেষ করে যেখানে ‘সম্বন্ধম’ প্রথার বিবাহ প্রচলিত আছে, সেখানে বিবাহ-বিচ্ছেদ কঠিন ব্যাপার নয়। উত্তর ভারতের জৌনসর বাওয়ার অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রচলিত আছে। সেখানে একে ‘ছুট’ বলা হয়। মুখের কথায় বা লিখিতভাবে যে কোনো সময় যে কোনো স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে পারে, যে পরবর্তী পুরুষ তাঁকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করবেন, তিনি প্রথম স্বামীকে দ্বিগুণ ‘জিওধন’ বা কন্যাপণ দিতে প্রস্তুত থাকেন। উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দেরাদুনের চাকরত তহশীলে পূর্বস্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন স্ত্রীলোককে বিবাহ করতে হলে পাত্র কর্তৃক কন্যার পিতাকে বিবাহের আনুষ্ঠানিক ব্যয় বাবদ ‘জিওধন’ দেওয়ার প্রথা প্রচলিত আছে। তিহরি গাড়ওয়াল অঞ্চলের ডোম জাতির মধ্যেও বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রথা প্রচলিত আছে। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের সম্মতি অনুসারে বিবাহ সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। তবে কোনো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্যতিরেকে আজকাল বিবাহ-বিচ্ছেদ সচরাচর ঘটে না।
অনেক জায়গায় আবার বিবাহ-বিচ্ছেদের ফলে স্ত্রীলোকের পদমর্যাদা বেড়ে যায়। দক্ষিণ ভারতের কুরুবদের মধ্যে যে স্ত্রীলোক সাতবার স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সে স্ত্রীলোকের পদমর্যাদা আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনেক উচ্চ। বিবাহের আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপারে এরূপ স্ত্রীলোক সাধারণত নেতৃস্থানী অধিকার করেন। মধ্য প্রদেশেও অনেক জাতির মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রথা প্রচলিত আছে। সেখানে প্রথম স্বামী কন্যাপণ ফেরত পেলেই স্ত্রীকে অনুমতি দেন অপরের সঙ্গে চলে যেতে এবং তাঁকে বিবাহ করতে। তারপর পঞ্চায়েতকে ভোজন করিয়ে দিলেই বিবাহ-বিচ্ছেদ ও নতুন বিবাহ অনুমোদিত হয়।
হোশঙ্গাবাদের রাজপুতবংশীয় যাদব নামে এক উচ্চ জাতির মধ্যে কোনো কোনো নারী তাঁর সমগ্র জীবনকালের মধ্যে নয়-দশবার পর্যন্ত বিবাহ বন্ধন বিচ্ছিন্ন করতে পারেন। বিহারের নিম্নজাতিসমূহের মধ্যেও বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রথা প্রচলিত আছে। এক কথায়, সমগ্র ভারতেই নিম্নশ্রেণীর কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর অস্ত্যজ জাতিসমূহের মধ্যে বিবাহের সম্পর্ক খুব সহজভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায়। ১৯৫৬ সালে প্রণীত হিন্দু বিবাহ আইন দ্বারা হিন্দুদের মধ্যে আদালতের সাহায্যে ক্ষেত্রবিশেষে বিবাহ-বিচ্ছেদ সহজ হয়ে গেছে।
”বিধবা বিবাহ” গ্রন্থে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লিখেছেন, “হে ভারতবর্ষীয় মানবগণ! …অভ্যাসদোষে তোমাদের বুদ্ধিবৃত্তি ও ধর্মপ্রবৃত্তি সকল এরূপ কলুষিত হইয়া গিয়াছে ও অভিভূত হইয়া রহিয়াছে যে, হতভাগা বিধবাদিগের দুরবস্থা দর্শনে, তোমাদের চিরশুষ্ক নীরস হৃদয়ে কারুণ্য রসের সঞ্চার হওয়া কঠিন এবং ব্যাভিচার দোষের ও ভ্রূণহত্যা পাপের প্রবল স্রোতে দেশ উচ্ছ্বলিত হইতে দেখিয়াও, মনে ঘৃণার উদয় হওয়া অসম্ভাবিত। তোমরা প্রাণতুল্য কন্যা প্রভৃতিকে বৈধব্যযন্ত্রণানলে দগ্ধ করিতে সম্মত আছ; তাহারা দুর্নিবার রিপুবশীভূত হইয়া ব্যাভিচারদোষে দূষিত হইলে তাহার পোষকতা করিতে সম্মত আছ; ধর্মলোপভাব জলাঞ্জলি দিয়া কেবল লোকলজ্জার ভয়ে, তাহাদের ভ্রূণহত্যার সহায়তা করিয়া, স্বয়ং সপরিবারে পাপপঙ্কে কলঙ্কিত হইতে সম্মত আছ, কিন্তু কি আশ্চর্য! শাস্ত্রের বিধি অবলম্বন পূর্বক, তাহাদের পুনরায় বিবাহ দিয়া, তাহাদিগকে দুঃসহ বৈধব্য যন্ত্রণা হইতে পরিত্রাণ করিতে এবং আপনাদিগকেও সকল বিপদ হইতে মুক্ত করিতে সম্মত নহ।”
বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য তার “সম্প্রদায়গত আইনের সংস্কার ও অন্যান্য” পুস্তকে বলেন, “হিন্দুশাস্ত্রে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ সম্পর্ক একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, পবিত্র বন্ধন এবং সামাজিক কল্যাণের জন্য এই বন্ধনকে অক্ষুন্ন রাখার সার্বিক প্রয়াস আমাদের সকলের দায়িত্ব। কিন্তু নৈতিকতার এই মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আইনের বাধ্যতামূলক বিধানের সামঞ্জস্য স্থাপন করাও আমাদের সামাজিক কর্তব্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর চরিত্র আচরণ এমন হতে পারে যে, তাদের পক্ষে এক পরিবারে দম্পতি হিসাবে বাস করা ব্যক্তিগত, পরিবারগত এবং সমাজগত কারণে অত্যন্ত অকল্যাণকর এবং সম্পূর্ণভাবে বর্জনীয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্যবস্থা হিসাবে স্বামী-স্ত্রীর পৃথক বসবাসের এবং কোনো কোনো চরম অবস্থায় বিবাহবন্ধন সম্পূর্ণ অবসানের অধিকার একটি সামাজিক প্রয়োজন বলে মনে হয়।”
ভারতীয় আইন ও বিচারিক নজীর
ভারতে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন প্রণীত হয় ১৯৫৫ সালে, যখন হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (Hindu Marriage Act, 1955) কার্যকর হয়। এই আইনে প্রথমবারের মতো হিন্দুদের জন্য বিবাহ বিচ্ছেদ (divorce) আইনি স্বীকৃতি পায়। এই আইনটি ভারতের স্বাধীনতার পর একটি বড় সামাজিক ও আইনগত সংস্কারের অংশ হিসেবে গৃহীত হয়। আইনটি হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রযোজ্য। এর মাধ্যমে বিবাহ, বিচ্ছেদ, বৈধতা, পুনর্বিবাহ, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রিত হয়। এই আইন ভারতীয় নারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল, কারণ এর মাধ্যমে তাঁরা প্রথমবারের মতো আইনি বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার লাভ করেন। ভারতে বিবাহ বিচ্ছেদ আইন পাশ করা হলেও বাংলাদেশে তা প্রযোজ্য নয়।
১৯৫৫ সালে প্রবর্তিত ভারতীয় হিন্দু বিবাহ আইনে বলা হয়েছে যে, কেউ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করলে আদালত তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘোষণা করতে পারে। ১৯৭৬ সালে ভারতীয় বিবাহ আইন সংশোধনীর পূর্বেও একই নিয়ম বহাল ছিল।
ভারতে আইনগত পৃথক অবস্থানও আছে। এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা বিবাহকে ভঙ্গ করে না, বরং সাময়িকভাবে স্বামী-স্ত্রীর পৃথক অবস্থান বোঝায়। আদালত থেকে এ ধরনের ডিক্রি পাওয়ার পর পারস্পরিক দৈহিক মিলনে বাধ্য নয়। তবে পৃথক অবস্থানের ডিক্রি পাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী কেউ কোনো তৃতীয় ব্যক্তির সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। কারণ, এরূপ দৈহিক সম্পর্ক ব্যাভিচার হিসাবে গণ্য হবে।
হিন্দু আইনে স্বধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করার ফলে কি হবে, সেটি “আয়েশা বিবি বনাম সুবোধ চন্দ্র চক্রবর্তী” (১৯৪৯) মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের একক বিচারপতির রায়ে বলা হয়, যখন কোনো হিন্দু স্ত্রী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তখন তার ওপর হিন্দু আইনের আর কোনো কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ থাকে না; তার বিবাহ নিজ থেকেই বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তখন আদালতকে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘোষণা থেকে নিবৃত্ত করার মতো হিন্দু আইনে করণীয় কোনো কিছুই নেই। ১৮৬৬ সনের নেটিভ কোর্টস ম্যারেজ ডিসলিউশন অ্যাক্ট এই আইনকে কিছু পরিমাণে পরিবর্তন সাধন করেছে।
আত্মশুদ্ধির একমাত্র উপায় বিয়ে
শাস্ত্র অনুযায়ী বিয়ে একটি পবিত্র আচার। মনে করা হয়, জন্মসূত্রে পুরুষের দেহে যে কালিমা সঞ্চিত হয়, বিয়ের মাধ্যমে তা বিদূরিত হয়। নারীর আত্মশুদ্ধিরও একমাত্র উপায় এটি। হিন্দু আইনে বিয়ে হচ্ছে ধর্মীয় বিধানের একটা দিক। এজন্য হিন্দু বিয়ে বিচ্ছেদযোগ্য নয়। দেবতাকে সাক্ষী রেখে কন্যা সম্প্রদান এবং গ্রহণ ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তাই, এটিকে চুক্তি হিসেবে গণ্য করা যায় না। স্বামী যতদিন জীবিত থাকবেন, স্ত্রীর কাছে ততদিন তিনি দেবতা হিসেবে বিবেচিত। অপরদিকে, স্ত্রীকেও স্বামীর দেহের অর্ধেক (অর্ধাঙ্গিনী) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বামীর সু এবং কু সকল কর্মের এবং কর্মফলের তিনি ভাগীদার।
হিন্দু বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্তান উৎপাদন এবং ধর্মীয় আচার সম্পাদন। বংশ রক্ষার প্রয়োজন এবং পুত্রের জন্ম দ্বারা পিণ্ডদান ক্রিয়া এবং শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুন্নাম অর্থাৎ পুত নামক নরক থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বিয়ে অপরিহার্য।
হিন্দু আইনে বিবাহকে একটি Sacrament বা ধর্মীয় সংস্কার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। হিন্দু আইনে যে কয়টি পবিত্র করণীয় ধর্মীয় সংস্কার রয়েছে, বিবাহ সেগুলোর মধ্যে একটি। শাস্ত্রমতে, “It is more a religious than a secular institution.” তাই মুসলিম আইনের মতো, এটাকে দেওয়ানি চুক্তি না বলে ধর্মীয় সংস্কার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হিন্দু বৈবাহিক মিলন অবিচ্ছেদ্য বলে গণ্য হয়। তাই চরিত্রের দিক হতে ধর্মনিরপেক্ষতার চাইতে ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের গুণেই বিবাহ সমধিক পরিচিত।
স্বামী-স্ত্রীরূপে পবিত্র জীবন যাপন করে ধর্মাচারণ তথা পিণ্ডদানই বিবাহের উদ্দেশ্য। হিন্দু বিবাহ এক হৃদয়ের সাথে অন্য হৃদয়ের স্পর্শ স্থাপন মাত্র। বিবাহের পর বর ও কনের দুটি হৃদয় এক হয়ে যায়। তখন তাদের মাঝে আর পৃথক কোনো সত্তা থাকে না। বিবাহের ফলে স্বামী-স্ত্রীর পাপ-পুণ্য, ধর্ম-কর্ম, জীবন-মৃত্যু একাকার হয়ে যায়। আর এ কারণেই স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে একই চিতায় জ্বলতে হতো।
হিন্দু আইনের বিধানমতে, বিবাহ একটি পবিত্র ধর্মভিত্তিক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নর-নারীর মাঝে আত্মার সাথে আত্মার মিলন ঘটে। এটা ইহলোক ও পরলোক পর্যন্ত বিস্তৃত। জীবন নির্বাহ প্রণালির সাথে সংশ্লিষ্ট বলে হিন্দুশাস্ত্রের মতে বিবাহ অবিচ্ছেদ্য।
স্বীকার-অস্বীকারের দোলাচলে প্রাজ্ঞজন
তবে এখন সচেতন, প্রাজ্ঞজন শাস্ত্র-আচার স্বীকার-অস্বীকারের দোলাচলে মনে করছেন যে, ভারতের মতো এবং নেপাল, মরিশাস ও অন্যান্য হিন্দু অধ্যুষিত রাষ্ট্রের মতো আমাদের বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের খোলনলচে পাল্টাতে হবে। যদিও আমাদের দেশে ২০১২ সালে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন হয়েছে, কিন্তু সেই আইনে বিবাহ নিবন্ধন ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়।
প্রকৃতপক্ষে, সনাতন ধর্ম শুধু গ্রন্থের পাতায় বন্দী নয়—এটি হৃদয়ের গভীর নিস্তব্ধতায় শ্রুত বিবেকের স্পন্দনে জাগ্রত হয়। বেদ, স্মৃতি ও সদাচারের পথধারাই একমাত্র নয়; অন্তঃস্থ আত্মার যে শুভবুদ্ধি, যে নিসর্গপ্রবাহের মতো প্রবাহমান শুভবোধ—তাও সনাতন ধর্মের অনুশাসনের অন্তর্গত। এই ধর্ম হিংসার অন্ধকারে নয়, সত্য-দয়া-অহিংসার দীপ্তিতে খোঁজে চেতনার উজ্জ্বল দিগন্ত।
শাস্ত্র কেবল বিধান দেয় না, জাগিয়ে তোলে উচ্চতর মানবতাবোধ। সনাতনের প্রকৃত আদর্শ কোনো স্বর্গলোভের মোহে বাঁধা নয়। এখানে মোক্ষ—সকল বন্ধন থেকে মুক্তি—হল পরম অভীষ্ট। তবে মোক্ষও কেবল অন্তিম নয়; এর ঊর্ধ্বে রয়েছে প্রেমময় ঈশ্বর-স্মরণ, সেই পঞ্চম পুরুষার্থ, যেখানে আত্মা বিলীন হয় প্রেম-সমুদ্রে, সেখানে আর ফেরার প্রয়োজন থাকে না।
যিনি নিঃস্বার্থ, যিনি কামনা-বিহীন হয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন—তাঁর গন্তব্য স্বর্গ নয়, বরং ঈশ্বরের অনন্ত অনুগ্রহে অনুরঞ্জিত প্রেম-লোক। স্বর্গে পাঠাবার যেসব প্রথাগত ধারণা আছে, সেগুলোর সীমানা পেরিয়ে যেতে হয় আমাদের মন ও মানসিকতাকে—কারণ প্রকৃত মোক্ষ মানে শুধু বন্ধনমুক্তি নয়, চেতনাজগতের পরিপূর্ণ জাগরণ।
বিয়েকে ‘জন্ম জন্মান্তরের পবিত্র বন্ধন’ বলা হয়—শব্দটি শুনলে মনে হয় যেন দুই আত্মার মিলন, দুটি জীবনের একত্রীকরণ। কিন্তু বাস্তবে, এই বন্ধনের শেকল যেন কেবল নারীর পায়ে বাঁধা। পুরুষের জন্য এ বন্ধন যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা—এক পিঁড়ি থেকে উঠেই সে বসতে পারে অন্য পিঁড়িতে, যতবার ইচ্ছে ততবার। কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা যেন তাকে ছুঁয়েও দেখে না।
পুরুষ ডিভোর্স দিক বা না দিক, নতুন করে বিয়ে করতে তার পথে কোনো বাধা থাকে না। কিন্তু নারী? যদি সে স্বামী-পরিত্যক্ত হয়, যদি স্বামী হয় নেশাগ্রস্ত, উন্মত্ত, মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত কিংবা জীবননাশকও—তবুও সেই নারীর জন্য নাকি মোক্ষ নেই। কারণ, তার বিয়েটি তো ‘জন্ম জন্মান্তরের’ বন্ধন! এই ধারণাকে পবিত্রতার মোড়কে সাজিয়ে নারীর স্বাধীনতা ও আত্মনির্ধারণের অধিকারকে রুদ্ধ করে রাখা হয়।
আসলে, এই কথাগুলো উচ্চারিত হয় না নারীর কল্যাণে, বরং ডিভোর্স আইনকে বাধাগ্রস্ত করতে, নারীর দ্বিতীয়বার বিয়ের অধিকারকে অস্বীকার করতে। অথচ সনাতন ধর্মের অন্তর্গত বহু গ্রন্থ—যেমন পরাশর সংহিতা—এই অনমনীয়তার পক্ষে নয়। চতুর্থ অধ্যায়ের ২৭ নম্বর শ্লোকে পরাশর স্পষ্ট করে বলেছেন, এমন বহু পরিস্থিতি আছে যেখানে নারীর পুনর্বিবাহ গ্রহণযোগ্য ও অনুমোদিত।
অতএব, ধর্মের নামে নারীর জীবনে যে অবিচার, তা আসলে ধর্মের অপব্যাখ্যা। প্রকৃত ধর্ম নারীর অধিকারকে অস্বীকার করে না, বরং সম্মান ও সমতা প্রদান করে। সনাতন ধর্মের মূল চেতনায় আছে দয়া, যুক্তি, ন্যায় এবং সর্বোপরি মানবিকতা—সেগুলোকেই ফিরে দেখা দরকার, ধর্মকে হৃদয়ের সত্য হিসেবে বোঝা দরকার, নিছক সামাজিক শৃঙ্খলের হাতিয়ার হিসেবে নয়।
শাস্ত্রীয় বিধান নাকি সংস্কার?
বিয়ে শুধুমাত্র একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং তা ধর্ম, সংস্কৃতি, আইন এবং মানবিক অধিকার—এই চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি গভীর প্রতিষ্ঠান। শাস্ত্রে বিবাহের যে আট প্রকার বর্ণিত আছে, তার প্রতিটির পেছনে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু আজ যখন আমরা আধুনিকতা, মানবাধিকার এবং আইনের আলোকে সেগুলোর মূল্যায়ন করি, তখন কিছু প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
‘ব্রাহ্ম বিবাহ’—যেখানে কন্যা নিঃস্বার্থভাবে দান করা হয়—শাস্ত্রমতে সর্বোচ্চ পুণ্যের বিবাহ। অথচ সেই ‘দান’ শব্দটি নারীকে এক অবজেক্টে পরিণত করে, যেন তিনি দাতার সম্পদ। অন্যদিকে, ‘আসুর বিবাহে’ কন্যা বিক্রয় হয় পণ গ্রহণ করে—এটি আবার এক ধরনের লেনদেন। ‘গান্ধর্ব বিবাহ’—যেখানে পাত্র-পাত্রীর পরস্পর সম্মতিতে বিবাহ হয়—তা তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে, অথচ এটিই সর্বাধিক মানবিক ও স্বাধীনতাপূর্ণ বিবাহের রূপ।
আলোচনায় প্রাসঙ্গিক যে, কোন বিবাহটি ‘জন্ম জন্মান্তরের বন্ধন’—তাহলে কি শুধু ব্রাহ্ম বিবাহ? প্রাজাপত্য বিবাহ? নাকি সেই বিবাহ, যেখানে নারী নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে পারে?
বিচারের জায়গায় সবচেয়ে বেদনাদায়ক হল যে, এসব বিবাহের অধিকাংশতেই নারী ‘দানের’, ‘বিক্রয়ের’, কিংবা ‘উপভোগের’ বস্তু হিসেবে উপস্থাপিত। অথচ শাস্ত্রেই বলা হয়েছে, নারীও মানুষ, চেতনাসম্পন্ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। ‘জন্ম জন্মান্তরের বন্ধন’ কেবল তখনই সত্য হয়, যখন তা দুই পক্ষের সম্মতিতে, মর্যাদা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। নয়তো তা একতরফা বঞ্চনার চুক্তি।
আরও গভীর প্রশ্ন হলো, কেন হিন্দু বিবাহকে নিবন্ধন করতে হবে না? জন্ম যখন সরকারের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়, মৃত্যু যখন সরকারি প্রমাণ চায়, তখন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—বিবাহ—তাকে লিপিবদ্ধ করতে আপত্তি কেন?
বাংলাদেশের হিন্দু নারীদের জন্য এখনো কোনো বৈধ বিবাহ বিচ্ছেদ আইন নেই। একজন নারী যদি নিদারুণ পরিস্থিতিতেও স্বামী থেকে আলাদা হতে চান, তবে তিনি আইনি বিচ্ছেদ পান না। অথচ এক পুরুষ একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছেন, কোনো শাস্তি ছাড়াই। যেখানে নারীর জন্য একটিই বিবাহ জন্মান্তরের বন্ধন, সেখানে পুরুষের জন্য প্রতিটি বিবাহ যেন একটি নতুন “অধিকার”। এই বৈষম্য দূর না করলে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
‘ধর্ম’ যদি মানবতার উপরে না হয়, তাহলে সেই ধর্ম নয়, বরং একরকম শোষণব্যবস্থা। বৃহস্পতি, ঈশোপনিষদ, মহাভারত এবং গীতায় বারবার এই এক বাক্য ফিরে আসে—“যা নিজেকে অপছন্দনীয়, তা অন্যের প্রতি করো না।” এটি শুধু একটি নৈতিক বাক্য নয়, এটি ধর্মের সার।
আমাদের দেশে হিন্দু দম্পতির দাবি উচ্চকিত হতে দেয় না এই সমাজেরই প্রতিক্রিয়াশীল একটি অংশ। সে কারণে বিকৃত, রুচিহীন, লম্পট, মদ্যপ স্বামীদের সঙ্গে এক ছাদের তলায় এক শয্যায় ঘুমাতে হয় স্ত্রীদের। সহধর্ম না করেও সহধর্মিণীর দিনগত পাপক্ষয় করতে হয় তাদের। আর বাধ্য হতে হয় তার যুযুধান সবচেয়ে সমীপবর্তী শিকার সন্তানের কল্যাণ-অকল্যাণের কথা চিন্তা করে। আর নারীর এমনকি পুরুষেরও আত্মহনন তো নৈমিত্তিক ঘটনা।
ঔপনিবেশিক মানসিকতা নিয়ে শাস্ত্রীয় আইনের ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী হয়ে যাপিত জীবনের কোনো সদর্থক দাঁড়ায় না। এ বিষয়ে বর্তমানে ভারতে দ্বিতীয় বিয়ে অথবা বিবাহ বিচ্ছেদের আইন আনা হলেও আমাদের বাংলাদেশে কিন্তু সেটা করা যাচ্ছে না। বিদ্যাসাগরের দেখানো পথে আমাদের অগ্রসর হতে বাধা দিচ্ছে পুরুষতন্ত্রের ধারক প্রতিক্রিয়াশীল একটি গোষ্ঠী। তাদের কথা, “হিন্দু বিবাহ জন্ম জন্মান্তরের”। সুবিধাবাদী প্রবঞ্চক এই দল কিন্তু শুধু নারীর বেলায় নানা রকমের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে নানা রকম অপযুক্তি হাজির করছে। নিজেদের ক্ষেত্রে কি উল্টোটা।
আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে পুরুষ হাজার বিয়ে করতে পারে। হিন্দু আইন এতে বাধা দিতে পারবে না। আমাদের দেশে প্রচলিত হিন্দু আইনে উপপত্নী গ্রহণও শাস্ত্র ও আইনসম্মত। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “প্রেমহীন দাম্পত্যজীবন ব্যভিচারের নামান্তর।” অথচ আমাদের দেশে প্রচুর হিন্দু যুগলকে ব্যভিচারই করতে হচ্ছে, বিচ্ছেদের অধিকার না থাকায়।
শাস্ত্রের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ
শাস্ত্র ও আইন উভয়ই মানুষের সভ্যতা ও কল্যাণের জন্য। শাস্ত্র মতে বিবাহ একটি ধর্মীয় ও জন্ম-জন্মান্তরের পবিত্র বন্ধন হলেও বহু জন্ম পার হয়ে পাওয়া মানবজন্ম সার্থক করার অধিকার নারী ও পুরুষ উভয়েরই। তাই হিন্দু শাস্ত্র কখনোই কোনো তিক্ত বৈবাহিক সম্পর্ককে গ্রহণযোগ্য করেনি। মহর্ষি মনু পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন। যদি প্রথম স্ত্রী মদ্যপায়িনী হয়, দীর্ঘকাল ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকে, প্রবঞ্চক হয়, কটুভাষী হয়, অমিতব্যয়ী হয় এবং শুধু কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়, তবেই তার পরিবর্তে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করা যাবে। তবে অবশ্যই তাকে শোধরানোর চেষ্টা করতে হবে।
অথচ, প্রপঞ্চ ভ্রমে অকল্যাণ আর অশুভের দিকে আমরা পথ হাঁটছি নিরন্তর। যন্ত্রণাক্লিষ্ট দম্পতিদের উপশম নেই। কেননা আমাদের দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের বৈধতা নেই। বিবাহ বিচ্ছেদ ছাড়াই হিন্দু পুরুষরা যত ইচ্ছা বিয়ে করতে পারে; কিন্তু হিন্দু নারীদের পুনর্বিবাহের অধিকার নেই। কোনো হিন্দু নারীর স্বামী অসৎ ও দুবৃত্ত হলে কিংবা তার সঙ্গে বসবাস না করলেও নিজেকে সেই পুরুষেরই স্ত্রী পরিচয় দিয়ে আজীবন সতীত্বের পরীক্ষা দিয়ে বাঁচতে হয় হিন্দু নারীকে।
নারীর সম্মতি, মর্যাদা, অধিকার, আইনসঙ্গত বিচ্ছেদ এবং পুনর্বিবাহ – এসব কিছুই ধর্মের বিরোধী নয়। বরং এগুলো ধর্মের প্রকৃত চেতনারই প্রকাশ। যারা নিজেদের সুবিধার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে নারীর অধিকার হরণ করে, তারাই প্রকৃত ‘বিধর্মী’। পরিবর্তন চাওয়াটা অধিকার নয়, দায়িত্ব – আর এই দায়িত্ব নিতে হলে সাহসিকতার সঙ্গে আমাদের এই আলোচনাগুলো সমাজের মূলধারায় আনতে হবে।
প্রকাশ বিশ্বাস, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফর বাংলাদেশ
লেখক, গবেষক ও আইনজ্ঞ
Discover more from মত-প্রতিমত
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
