শৃঙ্খলাভাঙ্গি, বেহিসেবি জীবন আমাকে ডাকবে ভেবে!
প্রতিদিন হাজার রকম ব্যস্ততার ভান করি, তবু কেন যে ব্যস্ত মানুষ আর কোলাহলের সাথে মিশে যেতে পারি না! কেউ কেউ বলেন, মুহূর্ত হাতছাড়া হয়ে গেলে নাকি হারিয়ে যায় সুযোগ। কোর্ট-কাচারির ক্ষেত্রে সেটা চিরায়ত সত্য। স্বপ্নের ক্যারিয়ার তৈরির জন্য ছিল না আরও অনেকের মতো কোনো কৌশল।
পরিকল্পনাবিহীন পথ চলতে চলতেই মহাকবি ইকবাল আওড়াই—
ঝকমকে রাজপ্রাসাদ তো তোমার ঘর নয়,
তুমি ঈগল, ঘর বাঁধবে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের উপর।
হাজার মুখের মধ্যে নিঃসঙ্গতার সঙ্গী খুঁজি… খুঁজে না পাওয়ার অধিক আনন্দে! তলিয়ে যেতে খুব ইচ্ছে করে, রাঙা শৈশবের মতোই আত্মকেন্দ্রিক নিঃসঙ্গতায়। সংশয়বাদী তাই হয়তো ফরাসি কবি র্যাবোর মতো করে বলতে পারি না যে, ‘দুর্ভাগ্যই আমার ঈশ্বর’। শেষমেশ আমি তো আবুল হাসানেই ভরসা খুঁজি—
এখন তুমি কোথায় যাবে?
কোন আঘাটার জল ঘোলাবে?
কোন আগুনের স্পর্শ নেবে
রক্তে কি প্রবলেম?
আইন অঙ্গনে আমার পদচারণা শুরু ২০০৭ এর দিকে। অ্যাডভোকেট আবেদ রাজার চেম্বার থেকে যাত্রা শুরু। নিম্ন আদালতে রাজা ভাইয়ের তখন অনেক মামলা ছিল। আদালতে তাঁর উপস্থাপনা ছিল চিত্তাকর্ষক। তখন থেকেই প্রকাশ দাদা, উজ্জ্বলসহ ঢাকার আদালতপাড়ার আইন প্রতিবেদক অনেকের সাথেই সখ্য। স্মৃতি অতীত হলেও ভুলে যেতে চাই না; কারণ এটি আমাদের ভবিষ্যৎকে জোরালো ভিত্তি দেয়।
আইনজীবী সমিতির তখন ছিল টিনশেড ভবন। সেখানে কাঠের সিঁড়ি মাড়িয়ে তিনতলায় উঠতে হতো। যেখানে প্রকাশ দাদা, আশরাফ ভাই, আজাদ ভাই, কল্যাণ দাদা, সৈয়দা জেসি, সৈয়দ আহমেদ মুস্তফা রানা, জিয়া ভাই, মুমু আপা, কুন্তলা গোমেজ, জাকিয়া আজাদ মণি সহ অনেকের সাথেই গল্প, আড্ডা হতো। মিরপুর ল কলেজের প্রিন্সিপাল, সুদর্শন আনিসুজ্জামান স্যার দেখা হলেই হাত ধরে বটতলায় নিয়ে যেতেন আর কচি ডাব খাওয়াতেন! সিভিল মামলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এখলাসুর রহমান। আর অবসরে লাইব্রেরিতে চোখ বন্ধ করে সংবাদ পত্রের শিরোনাম শুনতে চাইতেন। শিরোনাম পছন্দ হলে পুরো নিউজটাই আবৃত্তির মতো করে তাঁকে শোনাতে হতো!
ঢাকা বারের ক্যান্টিনের বিখ্যাত ‘দই’ যেন মনে হতো অমৃত! একেবারে তাজা চাপাতার ব্যবহারে তৈরি রং চা-ও ছিল অপূর্ব। সেই সময় ঢাকা বারের স্ট্রিট ফুড ছিল বাহারি রকমের। দুপুর বারোটা বাজলেই বটগাছের নীচে সব প্রিয় মানুষদের সাথে কীভাবে কীভাবে জানি দেখা হয়ে যেতো! মাঝে মাঝে আমরা কোর্ট হাউস স্ট্রিটের ক্যান্টিনে দুপুরের লাঞ্চ না করে জনসন রোডের দিকে ছুটে যেতাম। সেখানে ঘরোয়া বা স্টার কাবাবে লাঞ্চ সারতাম। কখনো আমিনুল গণি টিটো ভাইয়ের চেম্বারে নিয়ে যেতেন প্রকাশ দাদা। সেখানে আইনের চাইতে বেশি সমসাময়িক রাজনীতি এবং সাহিত্য নিয়ে আলাপ হতো।
এরপর আমি আদালতপাড়া ছেড়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেছি। সে চাকরির সূত্রেই কিনা পুরোটা দেশ ঘুরে দেখা হয়েছে। মনে পড়ে, কী এক অপার বিস্ময় নিয়ে সেই সময় ঘুরেছি বাংলার পথে পথে! সাধারণ মানুষের জীবন উপলব্ধির জন্য বিভিন্ন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে। বাংলার জেলাগুলো ভ্রমণে গিয়ে আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে; এখানে প্রকৃতি এবং প্রাণ, দুটো সত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। লোভী মানুষের দ্বারা এখানে প্রকৃতি যতই বিনষ্ট হোক না কেন, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের লড়াই থেমে থাকবে না।
একবার বন্ধুবর আইনজীবী নাসিরকে বলেছিলাম, আমি পথের শেষে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অধরা সৌন্দর্য ধরতে চাই!
ভ্রমণ আমার ছোটবেলার ভালোবাসা। মনে পড়ে, যখন ঠিকমতো দিক-দিগন্তের নামও উচ্চারণ করতে পারতাম না; তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম অচেনা কোনো জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছি। সম্পূর্ণ অচেনা এবং অজানা জায়গায় হারিয়ে যাবার আনন্দ বিভ্রান্তির কুয়াশা তৈরি করে না। বরং নিটোল ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয় মন; কেননা হারিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনটা যে জীবনের বিশেষ হিরন্ময় মুহূর্ত তা আপনি বাছাই করতে পারবেন না!
পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী লেখক ফ্রানৎস কাফকা। তাঁর একটা উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’। আধুনিক বুরোক্রেসির অদৃশ্য নিপীড়ন ছাড়াও মানুষ কিভাবে অজানা অপরাধে ফেঁসে যায়, সেখানে তা তুলে ধরা হয়েছে। আইনের উপর বাংলা ভাষায় অসাধারণ একটা ক্লাসিক লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গে শংকর, নাম ‘কত অজানারে’। শংকর নামে জনপ্রিয়তা পেলেও আসলে উনার পুরো নাম মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। আইন বিষয়ে মাত্র ১৯ বছর বয়সে এই উপন্যাসটি লিখে তিনি তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলেন। কলকাতার ওল্ড পোস্ট অফিস রোডের আদালতপাড়ায় ঘটে যাওয়া অনেকগুলো ঘটনা আর সেসব ঘটনার সাথে জড়িত মানুষগুলোর আখ্যান হচ্ছে এই বই। ‘চৌরঙ্গী’ হচ্ছে ‘কত অজানারে’ বইয়ের সিকুয়্যাল। অনেকেই হয়তো জানেন না, এটা একটা ট্রিলজি এবং এই ট্রিলজির শেষ বই হচ্ছে ‘ঘরের মধ্যে ঘর’। আইন সাহিত্যে আরেকটা বিখ্যাত উপন্যাস ‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’, লিখেছেন ফিওদোর দস্তয়েভস্কি।
আইন পেশাটা অনেক মর্যাদাপূর্ণ আর অভিজাত। কালো প্যান্ট, সাদা শার্ট, গলায় কালো টাই পরা মানুষদের দেখলে ছোটবেলায় একটা শ্রদ্ধার অনুভূতি তৈরি হতো। মফস্বল শহরে আইনজীবীদের সাইনবোর্ডও আমাকে আকর্ষণ করতো। মনে হতো, একদিন যদি আমিও উনাদের মতো একজন হতে পারতাম!
প্রথম প্রথম ভাবতাম, বার কাউন্সিলের সনদ থাকলেই বুঝি মানুষ বলবে ‘লার্নেড’ আর সেই সাথে আয়-ইনকামও হবে প্রচুর! কিন্তু পুরোটাই মোহের জাল। আসল স্ট্রাগল শুরু হয় আইনজীবীদের সনদ পাওয়ার পরই। নিজের মামলা-মোকদ্দমা সংগ্রহ করতে হয়। যেখানে কেউ কাউকে সাহায্য করে না। পদে পদেই চ্যালেঞ্জ শুধু চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র থেকে এই পেশাটা অনেক বেশি অবহেলিত। একজন ডাক্তার ইন্টার্নি করার সময় বেতন পায়। ইঞ্জিনিয়াররাও ইন্টার্নি করার সময় সম্মানী পায়। বার কাউন্সিল পরীক্ষা অনেক প্রতিযোগিতামূলক আর কঠিন; বিসিএস সমমানের পরিশ্রম করে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরও এখানে রাষ্ট্র থেকে কোনো প্রণোদনা মেলে না। বরং বার কাউন্সিল, বার এসোসিয়েশন, ইনকাম ট্যাক্স ফি বছর বছর বাড়তেই থাকে আইনজীবীদের। সেটা ইনকাম থাকুক বা না থাকুক!
আমি পৃথিবীর নানা দেশ ভ্রমণ করেছি বটে কিন্তু স্থিতু হতে পারিনি কোথাও। জার্মানি আমার খুব ভালো লেগেছিল। চাইলে জার্মানি থাকতে পারতাম। সুযোগ-সম্ভাবনা দলিত-মথিত করে দেশের মায়ায় ছুটে এসেছি। এর মধ্যে আমার দুই বন্ধু অ্যাডভোকেট ইব্রাহীম খলিল মজুমদার এবং নাসির উদ্দিন নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়েছে উচ্চ-আদালতে প্র্যাকটিস করার জন্য। আমার জীবনের লড়াইয়ে এই দু’জনের ভূমিকা সবিশেষ। সিনিয়র অ্যাডভোকেট জাহিদুল বারী স্যারের কাছেও অনেক দেনা। স্যার প্র্যাকটিসে আমার দেখা সফল একজন আইনজীবী একই সাথে মানবিক একজন মানুষও। স্যারের কেস বিশ্লেষণ ও যুক্তি উপস্থাপনের কৌশল, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, তীব্র আত্মবিশ্বাস, যুক্তিবাদী মন এবং যোগাযোগ দক্ষতা আমার ভালো লাগে। প্রতিদিনই নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার একটা প্রচেষ্টা উনার মধ্যে বিদ্যমান। প্রযুক্তির সাথে সাথে নিজেকেও তিনি আপডেট করে রাখেন।
বলাই বাহুল্য যে, আমি সামান্য মানুষ। তবু আমাকে বলা হয়েছে একটি অসামান্য কাজ করতে। আইনপেশা নিয়ে কিছু একটা নিজের মতো করে লিখতে। তাও কিনা আইন অঙ্গনের রথি-মহারথি, বিজ্ঞদের একটা পোর্টালে। সক্রেটিস বলেছিলেন, জীবনের অর্থ খুঁজতে হলে আগে নিজের ভিতরের সত্যকে আবিষ্কার করো। আদালতপাড়ায় ধোঁয়ার কুন্ডলী রাগত চেহারা নিয়ে যতই শাসাক; একজন প্রকৃত আইনজীবীকে তাঁর মোয়াক্কেলের পক্ষে একটা নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ে নামতে হয়। ফি পেলেও নামতে হয় আবার ফি না পেয়েও হতদরিদ্র মোয়াক্কেলের জন্য লড়াইয়ের জন্য মাঠে থাকতে হয়। মনে রাখতে হয়, দুনিয়ার দেশে দেশে এখনো ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক থাকা হাজারো মানুষের কাছে; একজন আইনজীবীই ঈশ্বরের পরে দ্বিতীয় আলোর রশ্মি। এখনো একজন আইনজীবীকে দেখা মাত্রই মজলুম আসামীর চোখ দুটো ঈষৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে! জয় করার জন্য একটা বিশাল পৃথিবী সামনে দাঁড়িয়ে আছে, এটা ভেবে একজন আইনজীবী সিনা টানটান করে যখন এজলাসের দিকে এগিয়ে যান। দীর্ঘশ্বাসের ভেতর দিয়েও মুহূর্তের এক বেদনাঘন আনন্দ ছড়িয়ে যায় তাতে। কয়েদখানায় অধিকারের জন্য সংগ্রামরত সকল প্রাণ উষ্ণতায়-উদ্দীপনায় জেগে ওঠে।
মোস্তফা মহসীন, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
Discover more from মত-প্রতিমত
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

So good