বিচারিক প্রক্রিয়ায় ‘নকল’ বা ‘সার্টিফায়েড কপি’ একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। অথচ প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতির যুগেও নকল প্রদানের বিধি-বিধান আজও সেই পুরোনো পদ্ধতিই রয়ে গেছে, যা নিয়ে বিচারপ্রার্থী বা বিচার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের শেষ নেই।
বিচারিক আদালতের কোনো আদেশ বা রায় চ্যালেঞ্জ করতে চাইলে, সেই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বা রিভিশন আকারে যেতে চাইলে কিংবা তা বলবৎ করতে হলে, সংশ্লিষ্ট নকল আবশ্যক।
নকল উত্তোলনের দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানি
নকল উত্তোলনের বিধান রয়েছে ‘ফৌজদারি নিয়ম ও আদেশাবলীর’ ১৪তম অধ্যায়ে এবং ‘দেওয়ানি নিয়ম ও আদেশাবলীর’ ২৪তম অধ্যায়ে। দুই ক্ষেত্রেই মূল কাঠামো প্রায় অভিন্ন—আদালতে থাকবে একটি নকলখানা, সেখানে কিছু নির্ধারিত নকলকারী থাকবেন। নকল প্রার্থীকে প্রথমে দরখাস্ত জমা দিতে হবে। তারপর নকলকারী সেই দরখাস্ত নিয়ে মূল নথি সংগ্রহের জন্য ছুটবেন—কখনো এজলাসে, কখনো সেরেস্তায়, আবার কখনো রেকর্ড রুমে।
নথি হাতে এলে শুরু হয় নকল প্রস্তুতের কাজ—কখনো হাতে লেখা, কখনো কম্পিউটারে টাইপ করা। এরপর তুলনাকারী সেই নকল মিলিয়ে দেখবেন মূল নথির সঙ্গে, তারপর স্বাক্ষর ও অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে নকল পৌঁছে যাবে আবেদনকারীর হাতে। এই লম্বা পথে প্রতিটি ধাপে সময়ের গহ্বরে হারিয়ে যায় বিচারপ্রার্থীর আশার আলো।
যদি ‘তদবির’ নামক এক অলিখিত নিয়মের সহায়তা না থাকে, তবে নকল পাওয়া আরও দুষ্কর হয়ে ওঠে। তদবিরের অর্থ কী, তা আইন অঙ্গনের সকলেই কমবেশি জানেন।
মামলায় যখন অধিক আসামি, ভোগান্তি তখন চরমে
একটি মামলায় যখন অনেক আসামি থাকে, সাধারণত সবাই একজন উকিলের কাছে সাহায্যপ্রার্থী হন না। ফলে সবাই একদিনে জামিনও প্রার্থনা করেন না।
ধরা যাক, একটি মামলায় বিশ জন আসামি আছেন। তারা সবাই একসাথে কোনো একজন আইনজীবীর কাছে যাননি; বরং আলাদা আলাদাভাবে কয়েকজন আইনজীবী নিয়োগ করেছেন। ফলে তারা একদিনে জামিন আবেদনও করেন না।
আলোচনার সুবিধার্থে তাত্ত্বিকভাবে ধরে নেওয়া যাক (প্রকৃতপক্ষে বাস্তবে তা-ই ঘটে), সাতজন আসামি সাতদিনে পৃথকভাবে জামিন আবেদন করলেন। প্রথম দিন যিনি জামিনের আবেদন করলেন, তিনি সেদিনই নকলের জন্য দরখাস্ত করলেন। কিন্তু নকলকারী নিয়মিত আদালতে গেলেও নথি সংগ্রহ করতে পারেন না, কারণ জামিন শুনানি চলছে। জামিন শুনানি সম্পন্ন হলেও তিনি নথি পান না, কারণ শুনানি শেষে আদেশ লিখতে হয়, ফলে নথি এজলাসেই থেকে যায়। এক্ষেত্রে প্রথম দিন যিনি আবেদন করলেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সপ্তাহ ঘুরার আগে কোনোভাবেই তাঁর পক্ষে নকল পাওয়া সম্ভব নয়।
থানার মামলায় আরও ভোগান্তি
আগের উদাহরণটি ছিল একটি নালিশি মামলা (সিআর মামলা)–র প্রেক্ষাপটে। কিন্তু মামলাটি যদি থানায় দায়েরকৃত পুলিশি মামলা হয়, অর্থাৎ জিআর মামলা, তাহলে ভোগান্তির মাত্রা আরও তীব্র হয়।
এ ধরনের মামলার নথি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আগ পর্যন্ত জেনারেল রেজিস্ট্রার (জিআর) সেকশনে থেকে যায়। ফলে একাধিক আসামি থাকলে জটিলতা বেড়ে যায় বহুগুণে। এক্ষেত্রে বিশ জন আসামীর উদাহরণটিই ধরা যাক। সাতজন আইনজীবী পরপর সাত দিন পুট-আপ দিয়ে জামিন চাইছেন। প্রতিদিনের জন্য আলাদা আদালত নির্ধারিত হয়। দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে জানা যায় জামিন শুনানি কোন আদালতে হবে। এরপর শুরু হয় ছুটাছুটি—আদালতে নথি নিয়ে ছুটবেন জিআর শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার। শুনানি শেষে তিনি আবার সেই নথি নিয়ে ফিরবেন জিআর সেকশনে। বিচারকের মৌখিক নির্দেশনা অনুযায়ী লিখবেন আদেশ। তারপর সেই আদেশে স্বাক্ষর নিতে আবার ছুটতে হবে বিচারকের খাসকামরায়। সবশেষে, স্বাক্ষরিত আদেশসহ নথি ফিরে এলে তা জমা হবে জিআর সেকশনে—ততক্ষণে নকল শাখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
নকল সরবরাহে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
নথি সংগ্রহ, নকল প্রস্তুত, তুলনা এবং স্বাক্ষরের পুরো প্রক্রিয়ায় নকল পেতে অনেক সময় লেগে যায়। টাইপ হলেই নকলকারী নকল প্রার্থীকে নকল দিয়ে দেবেন, ব্যাপারটা এমন না; এর আছে আবার তুলনাকারী। নকল টাইপ হওয়ার পর তুলনাকারী নথির সাথে মিলিয়ে দেখবেন সবকিছু ঠিক আছে কিনা। তারপর নকলকারী, তুলনাকারী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সকলে মিলে স্বাক্ষর দিলেই তবে নকলটি হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত হবে।
নকলকারী, আদালত, আর রেকর্ড রুম—এই গ্যাঁড়াকলে পড়ে একদিকে নকলকারী ছুটছেন নথির খোঁজে, আইনজীবী ছুটছেন নকলকারীর পেছনে, আর বিচারপ্রার্থী ছুটছেন আইনজীবীর পেছনে। বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচারের পথে এই ছুটোছুটি যেন এক অন্তহীন ম্যারাথন। সিস্টেমের জটিলতায় ভয়াবহ এক প্রশাসনিক গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায় ন্যায়বিচারের আশু প্রয়াস।
সমস্যা এখানেই শেষ নয়, নথি সংগ্রহ করে নথি দেখে নকল প্রস্তুত করা এবং তুলনা ও স্বাক্ষর করার যে প্রক্রিয়া—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় নকলকারীরা হরহামেশাই ভুলত্রুটি করেন। বিশেষ করে ইংরেজিতে লেখা নকলের ক্ষেত্রে নকলকারী যে ভুল করবে এটা মোটামুটি শতভাগ নিশ্চিত।
নথি যখন দায়রা আদালতে?
আবারও ফিরে আসি উদাহরণে—ধরুন, বিশজন আসামির মধ্যে কোনো একজনের আইনজীবী জামিন নামঞ্জুর আদেশের নকল সংগ্রহ করতে পারলেন। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত দায়রা আদালতে ফৌজদারি বিবিধ মামলা (সিআর মিস) করে তার মক্কেলের জামিন প্রার্থনা করবেন। এ অবস্থায়, নির্ধারিত শুনানির তারিখে নথিটি নিম্ন আদালত বা জিআর সেকশন থেকে চলে যাবে দায়রা আদালতে। আর একবার নথি দায়রা আদালতে গেলে, নিম্ন আদালতের কার্যক্রম থেমে যায়। ফলে, যদি কোনো আসামি নথিটি দায়রা আদালতে যাওয়ার আগেই নকল সংগ্রহ করতে না পারেন, তবে তাকে অপেক্ষা করতে হবে অনেক সময়—কখনো কখনো মাসের পর মাস। শুধু মাত্র সময়মতো নকল না পাওয়ার কারণেই প্রায়ই কোনো না কোনো আসামিকে অতিরিক্ত কারাবাসে থাকতে হয়।
প্রযুক্তির যুগেও কেন এত পশ্চাদপদতা?
অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় আগে ফটোকপি মেশিনের আবিষ্কার এই দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে পারত। ১৯৫৯ সালে, যখন বিশ্বের প্রথম কার্যকর ফটোকপি মেশিন (Xerox 914) বাজারে আসে, তখন থেকেই নথি নকলের আধুনিক পদ্ধতি শুরু হয়। বিশ্বের অনেক দেশে দ্রুতই ফটোকপি প্রযুক্তি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং হাতে লেখা নকলের প্রয়োজনীয়তা প্রায় বিলুপ্ত হয়।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৮০-এর দশক থেকে ফটোকপি মেশিন সাধারণ মানুষের নাগালে আসে। এরপর থেকে ফটোকপি ও স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে নথির সঠিক অনুলিপি তৈরি করা সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে নকল পাওয়ার প্রাচীন পদ্ধতি এখনও টিকে আছে।
আধুনিক প্রযুক্তি হাতের নাগালে থাকার ফলে নথি দেখে নকল করার আবশ্যকতা হারিয়েছে বহু আগেই, তবুও সেই প্রাচীন পদ্ধতিই টিকে আছে এই দেশে। কেন আছে? এর উত্তর কেউ জানে না। প্রাচীন পদ্ধতির বিকল্প কী হতে পারে? এই অব্যবস্থা দূর করা কি খুব কঠিন? মোটেই নয়।
প্রযুক্তিই হতে পারে সহজ সমাধান
বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নথি বিচারিক আদালতেই থাকে। দেওয়ানি আদালতের নথি সেরেস্তায় সংরক্ষণ করা হয়। ফৌজদারি আদালতে আলাদাভাবে সেরেস্তা না থাকলেও নথিগুলো এজলাস কক্ষে সংরক্ষিত থাকে।
প্রতিটি আদালতে সঠিকভাবে কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন স্থাপন করা গেলে নকলখানা নামক এই অনর্থক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করা যেত। প্রতিটি দরখাস্তের ভিত্তিতে এজলাস, সেরেস্তা বা রেকর্ড রুম থেকে সরাসরি ফটোকপি করে সঠিকভাবে নকল সরবরাহ করা যেত। বিচারপ্রার্থীরা মুক্তি পেতেন সময়ের অপচয়, হয়রানি ও অকারণ তদবিরের বোঝা থেকে।
ফটোকপির সীমাবদ্ধতা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলার আদেশ ও রায়সমূহ বিচারকের নির্দেশনা অনুযায়ী আদালতের পেশকার লিখে থাকেন, তবে কিছু বিচারক নিজ হাতে এসব লিখে থাকেন। সাক্ষী ও জেরা সম্পর্কিত তথ্যও প্রায়ই বিচারক নিজেই লিখে থাকেন। তবে এসব হাতে লেখা নথি অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়, ফলে পড়তে সমস্যা হয়। এমনকি অনেক সময় আদালতের পুরোনো ও পেশাদার নকলকারীরা পর্যন্ত এ ধরনের লেখাগুলো সঠিকভাবে পড়তে পারেন না। এই অস্পষ্টতা কারণে তুলনাকৃত নকলেও ভুল থেকে যায়।
ঢাকার বাইরের অনেক জেলা ও দায়রা আদালতে নকল প্রদান করতে ফটোকপি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু হাতে লেখা নকলের ক্ষেত্রে যখন হাইকোর্টে আপিল বা রিভিশন করতে হয়, তখন আইনজীবীকে আবার কম্পিউটারে টাইপ করে আরেকটি কপি জমা দিতে হয়। এর ফলে একদিকে মূল নকলের কার্যকারিতা হ্রাস পায়, অন্যদিকে বাড়তি কাজের জন্য আইনজীবীকে অতিরিক্ত ফি দিতে হয়, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত খরচের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাস্তবসম্মত সমাধান: কম্পিউটার এবং ই-নকল
বর্তমানে আর আগের মতো কীবোর্ডের বোতাম টিপে টাইপ করতে হয় না; প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এমন অ্যাপ এবং সফটওয়্যার চলে এসেছে, যা মুখে বললেই নির্ভুলভাবে টাইপ করে দেয়। এই প্রযুক্তি এখন তৃণমূল পর্যায়েও সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছেছে।
প্রতিটি আদালতে সরকারিভাবে কম্পিউটারে দক্ষ একজন স্টেনোগ্রাফার নিয়োজিত থাকেন। যদি এজলাস কক্ষে তাদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়, তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা টাইপ করে নিতে পারেন। এর ফলে যেমন ভুল হওয়ার আশঙ্কা কমবে, তেমনি সাক্ষী নিজেও পড়তে পারবেন তার দেয়া জবানবন্দি।
এছাড়া, সঠিকভাবে ফোল্ডার ও ফাইল ব্যবস্থাপনা চালু হলে, কম্পিউটারে সংরক্ষিত আদেশ, রায় বা জবানবন্দির নকল তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া সম্ভব হবে। এতে বিচারপ্রার্থীকে নথির পেছনে দৌড়াতে হবে না।
এদিকে, ই-নকল সার্ভিস চালু হলে, অনলাইনের মাধ্যমে নকল সরবরাহের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। এর ফলে বিচারপ্রার্থীদের সময় বাঁচবে এবং নকলটির অরিজিনাল যাচাইও সহজ হবে।
কিন্তু, কে শোনে দুর্ভাগা মানুষের দীর্ঘশ্বাস, দুঃখ আর দুর্দশার কথা? সেগুলো নিরবই থেকে যায়, কোনো পরিবর্তন হয় না।
তারিক রিজভী, ব্যারিস্টার অ্যাট ল‘
অ্যাাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
Discover more from মত-প্রতিমত
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
