প্রকাশ বিশ্বাস একজন লেখক, গবেষক ও আইনজ্ঞ। তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ’আদালতে বাংলা ভাষার কান্না’ প্রবন্ধের প্রথম পর্বে তিনি আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহারের বাস্তবতা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
প্রকাশ বিশ্বাস দেখিয়েছেন, আদালতের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষ আইনের সেবা আরও সহজে পেতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া জাতির আদালতেই আজ মাতৃভাষা অবহেলিত।
প্রথম পর্বে আদালতে বাংলা ভাষার অবস্থান, আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং বাস্তবায়নের অভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছিলেন প্রকাশ বিশ্বাস। তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। বাংলা ভাষায় রায় লেখার প্রয়াসও দেখা গেছে, কিন্তু তা কতটা সফল? কেন এখনো বাংলার ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি? যেখানে বাংলার সাহসী যাত্রা এবং তবুও তাকে কেন তিরস্কারের শিকার হতে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন কি কখনো কেউ গভীরভাবে অনুভব করেছেন?
আদালতে বাংলা ভাষার কান্না: প্রথম পর্ব
বাংলায় রায়: অনুবাদ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা এবং বাস্তবায়ন
ভারতে বর্তমানে তাদের সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ২২টির মধ্যে ৯টি ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের রায় প্রদানে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়ায় তারা এই অনুবাদের ব্যবস্থা নিয়েছে। যতদূর জানা যায়, AI (Artificial Intelligence) বা MT (Machine Technology)-এর সাহায্য নেয়া হচ্ছে অনুবাদ প্রক্রিয়ায়। এই ধরনের অনুবাদ ব্যবস্থা কলকাতা হাই কোর্টেও অতীতে ছিল।
১৮৬২ সালে কলকাতা হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৬৭ সালের গোড়ার দিকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত সদ্য ব্যারিস্টারি পাস করে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। কিন্তু পেশায় তেমন কোনো সাফল্য আসেনি। তাই তিনি ১৮৭০ সালে আইন পেশা ছেড়ে মাসিক এক হাজার টাকা বেতনে কলকাতা হাইকোর্টের অনুবাদ বিভাগের পরীক্ষকের চাকরি গ্রহণ করেন। এ থেকে অনুমান করা যায়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কলকাতা হাইকোর্টে একটি অনুবাদ বিভাগ ছিল।
তবে প্রশ্ন হলো, কলকাতা হাইকোর্ট ব্রিটিশ রাজের অধীন ছিল, এবং তখন সরকারি ভাষা ছিল ইংরেজি, তাই অনুবাদ কেন্দ্রের প্রয়োজন ছিল। এখন স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা, তাহলে এখানে আবার অনুবাদ কেন্দ্রের প্রয়োজন কেন? প্রথম পর্বের একটি স্তবকে আমি বলেছি, যদি কোনো রায়ের আন্তর্জাতিক আবেদন আছে বলে বিচারক মনে করেন, তাহলে তিনি ইংরেজি ভাষায় রায় লিখতে পারেন। তবে বাংলায় লিখলে তখন অনুবাদ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্যভাবে সামনে আসে।
সাবেক একজন প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে যদি ভালো অনুবাদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়, তাহলে ইংরেজি ভাষায় লেখা সেসব রায় অনুবাদ করা যেতে পারে, যেগুলো বাংলায় অনূদিত হওয়া উচিত বলে বিচারপতিরা মনে করবেন। এই ব্যবস্থা এভাবেও হতে পারে—যদি কোনো বিচারক গুরুত্বপূর্ণ কোনো রায় বাংলায় দেন এবং মনে করেন যে রায়টি নতুন নজির স্থাপন করেছে, যা আইনবিজ্ঞান বা আন্তর্জাতিক আইন গবেষণাকে সমৃদ্ধ করতে পারে, তাহলে তিনি সেটি ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য অনুবাদ কেন্দ্রে পাঠাতে পারেন। তবে সংশ্লিষ্ট বিচারককে রায়ের শেষে তার গুরুত্ব উল্লেখ করে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং অনুবাদের জন্য সনদ (সার্টিফিকেট) প্রদান করতে হবে।
একইভাবে, যদি কোনো বিচারক ইংরেজিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রায় দেন এবং মনে করেন যে দেশের সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য তার বঙ্গানুবাদ প্রয়োজন, তাহলে তিনি একই পদ্ধতি অনুসরণ করে অনুবাদের জন্য সেটি কেন্দ্রে পাঠাতে পারেন। এতে উচ্চ আদালতের রায় যেমন বাংলায় পাওয়া যাবে, তেমনি বাংলায় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ রায়গুলোর অনূদিত সংস্করণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাঠকদের কাছে পৌঁছাবে, যা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও এর মান সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণা দেবে।
বৈদিশিক চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলা রায়ের প্রতিবন্ধকতা
ভাষান্তর বা অনুবাদের ব্যবস্থা চালু করার পরও কিছু প্রতিবন্ধকতা থেকে যেতে পারে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৮৯তম অবস্থানে রয়েছে। বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো সাধারণত বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সঙ্গে হয়ে থাকে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের বেকারত্ব দূরীকরণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো বিনিয়োগ। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার জন্য বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন জরুরি। কিন্তু যদি এসব চুক্তি বাস্তবায়নে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে এবং দেশের বেকারত্ব বাড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে, বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির মামলাগুলোর রায় এমন ভাষায় লেখা প্রয়োজন, যাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সহজে তা বুঝতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইংরেজি ভাষায় রায় লেখা স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক। তবে, সাধারণ মানুষের বুঝতে সুবিধার জন্য এমন রায়ের বাংলা অনুবাদ চাইলে তা পূর্বে উল্লেখিত পদ্ধতিতে করা যেতে পারে।
দেশের সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় রায় লেখা অবশ্যই একটি মহৎ উদ্যোগ, যা একজন বিচারকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে, বৈশ্বিক বিচার ব্যবস্থার মান বজায় রাখতে ভালো, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও যৌক্তিক রায় প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা উচিত নয়। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই রায়ের অনুবাদ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করলাম।
যদি সব বিচারকই বাংলা ভাষায় রায় লেখার চেষ্টা করেন তবে, রায় হতে হবে সুস্পষ্ট, যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সংগত। পাশাপাশি, বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায় রায় অনুবাদের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা উচিত, যা বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
আইন আছে, বাধাও আছে
বাংলা ভাষার প্রচলনের ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও আদালত এর আওতার বাইরে রয়েছে। এ প্রশ্নে বেশ কিছু দেওয়ানি বিষয়ের আবেদনপত্র নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ১৯৯১ সালের ৮ নভেম্বর হাইকোর্ট একটি রায় দেন। ওই রায়ে দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭(১) ধারার আলোকে বলা হয় যে, আদালতে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার—যেমন রায়, আরজি, সওয়াল-জবাব ইত্যদি ইংরেজিতে লেখা—বেআইনি নয়। তাই “বাংলা ভাষা প্রচলন আইন” কার্যকর হওয়ার আগে আদালতে যে প্রথা অনুসৃত হতো, তা চালু রাখা যেতে পারে।
ওই রায়ে ভাষার ব্যবহার সংক্রান্ত ব্যাখ্যাও প্রদান করা হয়, যেখানে ভাষার তিনটি প্রকারভেদ উল্লেখ করা হয়—রাষ্ট্রভাষা, সরকারের ভাষা ও আদালতের ভাষা।
রাষ্ট্রভাষা: যে ভাষা রাষ্ট্রের সব কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়;
সরকারের ভাষা: নির্বাহী কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভাষা;
আদালতের ভাষা: বিচারিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভাষা।
হাইকোর্টের এ রায়ের পর নিম্ন আদালতে আর বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়নি। শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের প্রশ্নটি সামনে আসে আর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়, কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। এমনকি আদালতে মাতৃভাষা ব্যবহারের বাধা হিসেবে দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারা সংশোধনের উদ্যোগও নেয়া হয় না। ফলে এই প্রতিশ্রুতিগুলো কেবলই ইথারে ভাসতে থাকে, মাটিবর্তী আর হয় না।
আইন কমিশনের সুপারিশ: নেই কোন কার্যকর পদক্ষেপ
আইন কমিশন আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনের সুপারিশ করলেও সরকার সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। সুপারিশে বলা হয়েছে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা বাংলা, তাই আইন করে আদালতে বাংলা ভাষা চালু করা উচিত। বিদ্যমান ইংরেজি আইনগুলোর বাংলা অনুবাদ করা জরুরি, উচ্চ আদালতেও বাংলায় বিচারকার্য পরিচালনা করা ও রায় লেখা প্রয়োজন। ১৯৮৭ সালের “বাংলা ভাষা প্রচলন আইন” আদালত ও অন্যান্য আইনি কাজে বাংলা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করলেও উচ্চ আদালতে ইংরেজির ব্যবহার নির্বিবাদে চলছে।
সুপারিশে আরও বলা হয়, রায় ইংরেজিতে লেখা হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার হন, কারণ তারা ইংরেজি ভাষা না বোঝার কারণে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। এই কারণে, আদালতের ভাষা গণমানুষের ভাষাকেই অনুসরণ করা উচিত, যাতে সাধারণ জনগণ তাদের অধিকার বুঝতে পারে এবং ন্যায়বিচার পেতে কোনো বাধা না আসে।
আইন কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংবিধানের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং “বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭” অনুযায়ী রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের সব কাজ বাংলায় সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু ‘হাসমতউল্লাহ বনাম আজমেরী বিবি ও অন্যান্য’ মামলার রায়ে হাইকোর্ট বলেন যে, দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭(২) ধারার ভিত্তিতে সরকার আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে কোনো ঘোষণা দেবেন না।
সুপারিশে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির দুটি এবং দেওয়ানী কার্যবিধির একটি ধারার কারণে আদালতের কাজে বাংলা ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা থেকে যায়। কোন প্রকার বাধা না থাকলেও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন নেই।
বাংলা রায়ের সাহসী যাত্রা, তবুও প্রতিবন্ধকতা
সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা যায়, বিচারপতিদের মধ্যে প্রয়াত আমীরুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম বাংলায় আদেশ ও রায় লেখা শুরু করেছিলেন। তবে সেগুলো আইন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি।
১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ও বিচারপতি হামিদুল হক সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ‘নজরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় বাংলায় রায় প্রদান করেন, যা ঢাকা ল’ রিপোর্টস-এ (৫০ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ১০৩) প্রকাশিত হয়।
একই দিনে ‘আবদুল আজীজ বনাম সেকান্দর আলী’ মামলায় বিচারপতি হামিদুল হক আরেকটি ফৌজদারি রিভিশনের রায় বাংলায় প্রদান করেন (৫০ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ১১১)। এরপর হাবিবুর রহমান বনাম সেরাজুল ইসলাম মামলায় বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বাংলায় রায় প্রদান করেন, যা ৫১ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ১৪৭-এ প্রকাশিত হয়।
ফৌজদারি মামলায় পুলিশের সাক্ষ্য কখন বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করা যাবে, তা ব্যাখ্যা করা হয় ‘আবদুর রেজ্জাক বনাম রাষ্ট্র’ মামলায়। এ রায়টি ৫১ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৮৩-তে প্রকাশিত হয়।
এছাড়া বিচারপতি হামিদুল হক ও বিচারপতি আবদুল কুদ্দুছ বাংলায় বেশ কয়েকটি নজির স্থাপনকারী রায় প্রদান করেছেন। সাম্প্রতিক বিচারপতিদের মধ্যে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক উচ্চ আদালতে বেশ কয়েকটি মামলার রায় বাংলায় দিয়েছেন। ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘মতিউর রহমান মিয়া বনাম আছিয়া খাতুন ও অন্যান্য’ মামলায় তিনি বাংলায় রায় প্রদান করেন, যা প্রমাণ করে যে উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহারে কোনো আইনি বাধা নেই।
তবে বাস্তবতা হলো, উচ্চ আদালতে বিচারপতিরা বাংলায় রায় লিখেন না বললেই চলে। এমনকি ২০০৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলায় লেখা একটি জামিন আবেদন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা আদালতে বাংলার ব্যবহার নিয়ে বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
জবানবন্দী লিখতে হবে সাক্ষীর নিজের ভাষায়
উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে, সাক্ষীর নিজস্ব ভাষা—তা আঞ্চলিক হোক বা প্রমিত—সেই ভাষাতেই তার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করতে হবে। যারা ইংরেজিতে লিখেন, তারা মনে করেন যে তারা ইংরেজি ভাষাভাষীদের মতোই ইংরেজি জানেন এবং ইংরেজিই তাদের ধ্যান-জ্ঞান। অবশ্য এদের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে।
একজন ফৌজদারি বিষয়ক প্রবীণ আইনজীবীর মুখ থেকে শোনা তার পেশাগত জীবনের একটি কাহিনি উল্লেখ না করে পারছি না। ঢাকার আদালতে মানিকগঞ্জের এক ব্যক্তি মাছ চুরির মামলায় বাদী হিসেবে জবানবন্দি দিচ্ছেন—
“তখন বিয়ান বেলা। ঘুম থিকা উইঠা অভ্যাস মতো চকের দিকে আটতে থাকি। পরেই ডাঙ্গার চালা। ডাঙ্গার পারে খাড়ায়া দেহি কি দূরে কয়েকজন দবুড় দিয়া পলাইয়া যাইতেছে। আমার রেইঞ্জের মইদ্যে তারা ছিল না। ডাঙ্গার পাড়ের চ্যারদিকে পানি থিকা জালে ওঠা তোলা ক্যাদা আর ক্যাদা। পাড়ে পানি ভেজা ক্যাদা মাখা একটি মাছ দরার জাল পাই।”
জজ সাহেব তার জবানবন্দি ইংরেজিতে লিখতে গিয়ে ‘দবুড়’ শব্দটির অনুবাদ করলেন chasing (ধাওয়া করা)। বাদীকে তার দেওয়া জবানবন্দি ব্যাখ্যা করা হলে তিনি বললেন, “এ কথা তো আমি বলি নাই!” এরপর তার আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক সংশ্লিষ্ট লাইনগুলো কেটে দেন। এতে সময় নষ্ট হয়, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা বিরক্ত হন।
তাহলে সমাধান কী?
আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধন যেমন জরুরি, তেমনি উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহারে নতুন আইন প্রণয়নও প্রয়োজন। অনেক আইনজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলন হলে সাধারণ মানুষ যেমন রায় বুঝতে সুবিধা পাবে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে রায়গুলোও স্বীকৃতি পাবে।
আইন-আদালত বিষয়ক শুদ্ধ বাংলা লেখার জন্য মানসম্মত অ্যাপ তৈরি করা যেতে পারে, যার ভিত্তিতে বাংলায় আবেদন ও রায় লেখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, বাংলা ব্যাকরণের অনলাইন সংস্করণ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
এসব বিষয় নিয়ে শীর্ষ আদালতের পুনরায় ভাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
প্রকাশ বিশ্বাস, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফর বাংলাদেশ
লেখক, গবেষক ও আইনজ্ঞ
Discover more from মত-প্রতিমত
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
